২০২০ সাল স্বর্ণের বাজারে ইতিহাস গড়ার বছর। নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীতে শেয়ার ও মুদ্রাবাজারে যখন টালমাটাল অবস্থা, তখন স্বর্ণের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। বাজার ব্যবস্থার স্বাভাবিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছে মূল্যবান ধাতুটির দাম। এ পরিস্থিতিতে আশাবাদী হয়ে ওঠেন বিনিয়োগকারীরা। বাজার বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দেন, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দাম চাঙ্গা থাকতে পারে। গড়তে পারে সর্বোচ্চ দামের নতুন রেকর্ড। তবে বছরের শেষভাগে এসে মূল্যবৃদ্ধির এ ধারা বজায় থাকেনি। বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকদের হতাশ করে কমে গেছে স্বর্ণের দাম।

বিদায়ী বছরের শুরু থেকে করোনা সংক্রমণ যত ছাড়িয়েছে, স্বর্ণের বাজার ততই চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। তবে মজার বিষয় হলো, স্বর্ণের দাম বাড়লেও এর চাহিদা কিন্তু খুব একটা বাড়েনি। বরং চীন ও ভারতসহ শীর্ষ ভোক্তা দেশগুলোয় ব্যক্তি পর্যায়ে স্বর্ণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মহামারীতে অনেকে বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকের আয় কমেছে। এসব কারণে উৎসবের মৌসুমেও ব্যক্তি পর্যায়ে স্বর্ণের চাহিদা বাড়েনি, যা বেড়েছে, সেটা বিনিয়োগকারীদের কাছে।

অর্থনীতির সাধারণ সূত্র বলে, চাহিদা কমলে পণ্যের দামও কমে যায়। তবে ২০২০ সালে স্বর্ণের বাজারে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। করোনাকালে চাহিদা সীমিত হলেও স্বর্ণের দাম লাগামহীন বেড়েছে। গত ২৭ জুলাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ওঠে ১ হাজার ৯৪৪ ডলারে, যা ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ। আগস্টে ইতিহাস গড়ে স্বর্ণের দাম। আউন্সপ্রতি ২ হাজার ৭২ ডলার ৫০ সেন্টে বিক্রি হয় মূল্যবান ধাতুটি। এর আগে কখনই এত বেশি দামে স্বর্ণ বিক্রি হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, করোনা মহামারীর কারণে শেয়ার ও মুদ্রাবাজারে টালমাটাল অবস্থা দেখা গেছে। এ পরিস্থিতিতে ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি ভরসা করেছেন বিনিয়োগকারীরা। এ ভরসাই সব নিয়ম ভেঙে স্বর্ণের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।

স্বর্ণের দামে এমন চাঙ্গা ভাব দেখে বেশির ভাগ বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের আশার কথা শোনায়। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে চাঙ্গা থাকতে পারে স্বর্ণের বাজার। এমনকি অনেকে বলে, বাড়তে বাড়তে স্বর্ণের আউন্স ২ হাজার ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি ২০২১ সালেরও বাড়তির পথে থাকতে পারে মূল্যবান ধাতুটির দাম। এমন পূর্বাভাসে বিনিয়োগকারীরা আরো আশাবাদী হয়ে ওঠেন।

তবে ২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই হতাশা ভর করেছে অনেক বিনিয়োগকারীর মনে। কেননা কমতে শুরু করেছে স্বর্ণের দাম। আগস্টের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ কমে সর্বশেষ কার্যদিবসে মূল্যবান ধাতুটির আউন্স ১ হাজার ৮৭৮ ডলারে নেমে এসেছে। বলা হচ্ছে, নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে চরম অনিশ্চয়তা ও সহিংসতার আশঙ্কা করা হয়েছিল, যা মহামারীকালে মার্কিন অর্থনীতির বিপর্যয় জোরালো করত। এ কারণে বিশ্লেষকরা স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তবে হোয়াইট হাউজে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও বড় কোনো অনিশ্চয়তা দেখা দেয়নি। এতে বিনিয়োগকারীদের হতাশ করে স্বর্ণের দাম কমে গেছে।

করোনা মহামারী ও এর জের ধরে সৃষ্ট অর্তনৈতিক শ্লথতা, মন্দাবস্থা বিদায়ী বছরে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিল। বছরের মাঝামাঝি সময়েও মনে করা হচ্ছিল, এ মহামারী সহসাই দূর হবে না। আশার আলো সুদূরপরাহত। তবে ২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই মহামারী পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইাউনিয়ন (ইইউ), সৌদি আরবসহ অনেক দেশে এরই মধ্যে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ২০২১-২২ সাল নাগাদ বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ করোনার ভ্যাকসিন পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মহামারীর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন আবিষ্কার ও প্রয়োগে এমন অর্জন ধাতুর বাজারে স্বর্ণের দাম কমিয়ে দিয়েছে। নতুন বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে মহামারী পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপর স্বর্ণের দামে ওঠা-নামা অনেকাংশে নির্ভর করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিটকো নিউজ ও এসপিগ্লোবালডটকম