আবহাওয়া ও জলবায়ুগত কারণে রাশিয়ায় উৎপাদিত গমের মান বেশ ভালো। উৎপাদনও হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ। এর জের ধরে বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে রাশিয়া। তবে কৃষিপণ্যটির বৈশ্বিক রফতানি বাজারে রাশিয়ার অন্য রকম আধিপত্য রয়েছে। কেননা গম রফতানিকারক দেশগুলোর বৈশ্বিক তালিকায় রাশিয়া শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। কৃষিপণ্যটির রফতানির পরিমাণে রাশিয়া অন্যান্য রফতানিকারক দেশের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে রাশিয়া।

মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পূর্বাভাস দেখলে গমের আন্তর্জাতিক বাজারে রুশ আধিপত্যের সুস্পষ্ট ধারণা মেলে। ইউএসডিএর ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে রাশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন গম রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছরও বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক দেশের তকমা ধরে রাখবে রাশিয়া।


চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো থেকে সব মিলিয়ে ২ কোটি ৮০ লাখ টন গম রফতানির পূর্বাভাস দিয়েছে ইউএসডিএ, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ দশমিক ২৯ শতাংশ কম। কৃষিপণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় ইইউভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান দ্বিতীয়।

তালিকায় এর পরই (তৃতীয় অবস্থানে) রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নাম। চলতি বছর দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ২ কোটি ৫৮ লাখ ৫৫ হাজার টন গম রফতানি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ইউএসডিএ। এর মধ্য দিয়ে দেশটি থেকে কৃষিপণ্যটির রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ কমতে পারে।


ইউএসডিএর এ পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর রাশিয়া একমাত্র দেশ যেখান থেকে তিন কোটি টনের বেশি গম রফতানি হবে। এমনকি ইইউভুক্ত দেশগুলোর সম্মিলিত গম রফতানি রাশিয়ার সম্ভাব্য রফতানির তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে থাকবে। এ থেকে গমের আন্তর্জাতিক বাজারে রুশ আধিপত্যের চিত্র বুঝতে পারা যায়।

২০১৭ সালে গম রফতানিকারকদের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষে উন্নীত হয় রাশিয়া। ওই বছর দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ৪ কোটি ১৪ লাখ ৩১ হাজার টন গম রফতানি হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় রেকর্ড ৪৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেশি। পরের দুই বছর রাশিয়া থেকে কৃষিপণ্যটির রফতানি কমে এসেছে। তবে দেশটি গমের শীর্ষ রফতানিকারকের অবস্থান ধরে রেখেছে।


গম ছাড়াও কয়েক বছর ধরে রাশিয়া যব, ভুট্টা, সরিষা, ওটসের বৈশ্বিক রফতানিকারকদের তালিকায় শীর্ষ দশে রয়েছে। তবে দেশটি থেকে সবচেয়ে বেশি রফতানি হওয়া শস্য গম। বর্তমানে কৃষিপণ্যটির বৈশ্বিক রফতানি বাজারের ২০ শতাংশের বেশি এককভাবে জোগান দেয় দেশটি।

এ বিষয়ে হামবুর্গভিত্তিক আরএএনইপির ফলিত অর্থনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ডেনিস টার্নভস্কি বলেন, গত এক দশকে গমের বৈশ্বিক রফতানি বাজারের পরিধি এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। তবে রাশিয়া থেকে কৃষিপণ্যটির রফতানি প্রবৃদ্ধি আরো জোরালো ছিল। এক দশকে রুশ গম রফতানি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

অথচ গত শতকের ষাটের দশকের শুরু থেকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের অন্যতম শস্য আমদারিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৬৩ সালে দেশটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১ কোটি ৪ লাখ টন গমসহ বিভিন্ন শস্য এবং ২১ লাখ টন ময়দা আমদানি করেছিল। এরপর সময় যত গড়িয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের শস্য আমদানি ততই বেড়েছে। ১৯৭২ সালে এর পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩০ লাখ টন। ১৯৮০ সাল নাগাদ আমদানির পরিমাণ আরো বেড়ে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩০ লাখ টনে। ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ৪ কোটি ৭০ লাখ টন শস্য আমদানির রেকর্ড করেছিল।

গমসহ শস্যের এমন আমদানিনির্ভরতা সোভিয়েত অর্থনীতির ভঙ্গুরতার ইঙ্গিত দেয়। যদিও ওই সময় দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত। ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি ও মহাকাশ জয় নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মস্কোর তুমুল বিরোধ ও প্রতিযোগিতা চলছিল। তবে অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও আমদানিনির্ভরতা এক পর্যায়ে দেশটিকে রাজনৈতিক সংস্কারের পথে এগিয়ে দেয়।

আশির দশকের শেষভাগে ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে রেকর্ড পতন দেখা দিলে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় শস্য আমদানি করার জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। ফলে দেশটি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়াতে বাধ্য হয়। ওই সময় শস্যের অভাব খাদ্য ঘাটতি ও জনসাধারণের মধ্যে অসন্তুষ্টি বাড়িয়ে তোলে, যা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত পতনের পেছনে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এক সময়ের আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশটি এখন বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান রাশ-ইনভেস্টের গবেষণা বিভাগের প্রধান দিমিত্রি ভেদেনকভ বলেন, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের চমত্কার আবহাওয়া রাশিয়ায় গমের বাম্পার ফলনের অন্যতম কারণ। বাড়তি উৎপাদন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে অভ্যন্তরীণ বাজারে দরপতনের লাগাম টানতে বেশি বেশি গম রফতানির চেষ্টা করে দেশটি। এ চেষ্টা দেশটিতে কৃষিপণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রাশিয়ায় সব মিলিয়ে ৭ কোটি ৭০ লাখ টন গম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে রাশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৮ কোটি ৫১ লাখ ৩৭ হাজার টন গম উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছিল। কৃষিপণ্যটি উৎপাদনের ক্ষেত্রে রাশিয়া ইইউ, চীন ও ভারতের পর চতুর্থ শীর্ষে রয়েছে।

রাশিয়ার ফেডারেল কাস্টমস সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) দেশটি থেকে রফতানি হওয়া গমসহ বিভিন্ন শস্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল তুরস্ক। তালিকায় এর পরই রয়েছে যথাক্রমে মিসর, সৌদি আরব, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, সুদান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আজারবাইজান ও মরক্কো। চলতি বছরের প্রথমার্ধে রাশিয়া ৩৫৬ কোটি ডলারের গমসহ বিভিন্ন শস্য রফতানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

ডেনিস টার্নভস্কি ব্যাখ্যা করেন, রাশিয়ায় গমের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি রফতানিকে গতি দান করেছে। আর উৎপাদন বৃদ্ধি মূলত কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এ কারণে ফলন বৃদ্ধির ফলে হয়েছে। লজিস্টিক অবকাঠামো (বন্দর টার্মিনাল) তৈরি ও রুশ মুদ্রা রুবলের অবমূল্যায়নের কারণে গম রফতানিতে রাশিয়ার শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে।

ওয়ার্ল্ডগ্রেইনডটকম ও রাশিয়া বিয়ন্ড অবলম্বনে