কিছুদিন ধরেই নেপালের বড় এলাচচাষীরা দামের কারণে হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। চলতি মৌসুমে ভারত ও ভুটানে মসলাপণ্যটির উৎপাদন কমে এসেছে। এর জের ধরে নেপালের এলাচচাষী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উত্ফুল্ল ভাব দেখা দিয়েছে। ভারত ও ভুটানের মতো প্রধান দুটি উৎপাদনকারী দেশে উৎপাদন কমে যাওয়া বিশ্ববাজারে নেপালি এলাচের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। এরই মধ্যে মসলাপণ্যটির দাম কেজিপ্রতি হাজার রুপিতে উন্নীত হওয়ার পথে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, মসলাপণ্যটির দাম কেজিপ্রতি হাজার রুপি ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৪ সালে প্রতি কেজি বড় এলাচের সর্বোচ্চ দাম ২ হাজার ৫০০ রুপিতে উন্নীত হয়েছিল। এর পর থেকেই পণ্যটির দাম পড়তির দিকে। গত বছর কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৭৫০ রুপি হয়েছিল। পাঁচ-ছয় বছর ধরে মসলাটির দাম আর না বাড়ায় হতাশা জেঁকে বসেছিল নেপালের চাষী ও ব্যবসায়ীদের।

তবে শুধু এলাচ নয়। ভারতে যেকোনো পণ্যের উৎপাদন হ্রাস ও মূল্যবৃদ্ধির সুফল পায় নেপাল। প্রতিবেশী দেশটিতে উৎপাদন হ্রাসের পর নেপাল এ বছর চায়ের উচ্চমূল্য পেয়েছে। তুমুল চাহিদা ও ভারতে বিশাল ঘাটতিতে নেপালি চায়ের দাম ৪০-৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে।


নেপালের বড় এলাচ উদ্যাক্তা সমিতির সদ্য সাবেক হওয়া সভাপতি নির্মল ভট্টরাইয়ের মতে, বড় এলাচের দাম গত বছর কেজিপ্রতি ৭৫০ রুপি ছিল। এ বছর নতুন এলাচ বাজারে আসতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ৮৭৫ রুপিতে পৌঁছেছে। দামটি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গেছে বলে জানান ভট্টরাই। তিনি বলেন, ভারত ও ভুটানে বড় এলাচের আবাদ কমে যাওয়ায় দামের এ ঊর্ধ্বগতির কারণ। যদিও নেপালের উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হিমালয় কন্যাখ্যাত নেপাল বিশ্বের বৃহত্তম বড় এলাচ উৎপাদক। বৈশ্বিক বাজারের ৬৮ শতাংশ এলাচ সরবরাহ করে নেপাল। এর পরই আছে বৈশ্বিক বাজারের ২২ শতাংশ শেয়ারের দখল নিয়ে ভারত এবং ৯ শতাংশ শেয়ারের দখল নিয়ে ভুটানের নাম।

নেপালের বাণিজ্য ও রফতানি প্রচার কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে দেশটি ২০০ কোটি রুপি মূল্যের এলাচ রফতানি করেছে। এ পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি। ওই সময় বড় এলাচের চালানের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫৬২ টন। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ১ হাজার ৯১৩ টন ছিল। আর্থিক মূল্যে এটি ৪০০ কোটি রুপি।

নির্মল ভট্টরাই আরো বলেন, হঠাৎ করে চাহিদা বৃদ্ধির পর নেপালি ব্যবসায়ীরা মসলা মজুদ করতে শুরু করেছিলেন। আর কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আসার খবরে রেস্তোরাঁ ও হোটেলগুলোর ব্যবসা চাঙ্গা হওয়া চাহিদা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

নেপালের বড় এলাচের বৃহত্তম ক্রেতা ভারত। রফতানির ৯৯ শতাংশ এলাচ যায় প্রতিবেশী দেশটিতে। ভারত থেকে মসলাটি পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় রফতানি করা হয়। অন্যদিকে পাকিস্তান এলাচের বৃহত্তম আমদানিকারক। ভারতের এলাচ রফতানির প্রায় ৬০ শতাংশই যায় পাকিস্তানে। মসলাপণ্যটি ব্যবহার করে তৈরি করা বিরিয়ানি ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে রয়েছে।

ভারতের প্রধান উৎপাদনশীল অঞ্চল দার্জিলিং ও সিকিমে প্রতি বছর বড় এলাচের উৎপাদন বাড়ছিল। তবে চলতি বছর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। ভুটানও এ বছর কম উৎপাদন করেছে। ভারত রফতানি কমিয়ে দিলে নেপালের বেশির ভাগ চালান বাংলাদেশে রফতানি হয়। এতে নেপালি চাষী ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হচ্ছেন বলে জানান নির্মল ভট্টরাই।

উদ্যোক্তা সমিতি আশা করছে, দামের সঙ্গে সঙ্গে রফতানিও ৪০-৫০ শতাংশ বাড়বে। বড় এলাচ তিনটি গ্রেড করা হয়—জাম্বো জেট, স্ট্যান্ডার্ড ও চলতি। গ্রেড অনুযায়ীই দাম নির্ধারণ করা হয়।

নেপালের ব্যবসায়ী সুজিত বামশা জানান, গত মঙ্গলবার বড় এলাচের দাম প্রতি কেজি হাজার রুপিতে উঠেছিল। প্রতি ঘণ্টায় দাম ওঠানামা করেছে। দিনের মধ্যভাগে তিনি মসলাটি ৫৭৫ টাকা কেজি দরে কিনেছিলেন। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়া তামলেজংয়ের কৃষকরা প্রতি কেজি ৪৭৫ টাকা করে বিক্রি করেছিলেন।

উদ্যাক্তা সমিতির সভাপতি রাজ কুমার কার্কি বলেন, উৎসব মৌসুম শেষে মূল্যবৃদ্ধির ফলে ব্যবসায়ী ও চাষীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। বিশ্ববাজারে মসলাটির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এখন নেপালের এলাচের দিকে মনোনিবেশ করেছেন। আর আমাদের অধিকাংশ এলাচ ভারতে চলে যায়। করোনাভাইরাসে দেশটির জীবিকা প্রভাবিত হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এমন পরিস্থিতি আরো দাম বাড়বে এমন প্রত্যাশায় নেপালি চাষীরা তাদের ফসল ধরে রেখেছেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে বড় এলাচের চাষ শুরু হয়ে শেষ হয় ডিসেম্বরে। চাষীরা তাদের ঘরে ও ব্যবসায়ীদের গুদামে মসলা সংরক্ষণ করেন। আবার অনেক চাষী এখনই তাদের ফসল বিক্রিও করে দিচ্ছেন।

 

হিমালয়ান টাইমস ও কাঠমান্ডু পোস্ট অবলম্বনে