বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিদ্যমান সংকট নিরসনে একযোগে কাজ করতে সম্মত হয়েছে শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি৭। বিশেষ করে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যাটারি তৈরির কাঁচামালের মতো মূল্যবান পদার্থের সরবরাহ যেন অক্ষুণ্ন থাকে, তা নিশ্চিতে কাজ করবে জোটের সদস্য দেশগুলো। এক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি কাঁচামালসমৃদ্ধ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ওপরও জোর দেয়া হবে। ওসাকায় গতকাল জি৭ ভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্যমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে জোটের এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী ইয়াসুতোশি নিশিমুরা। খবর নিক্কেই এশিয়া।

কভিড-১৯ মহামারীকালে সীমান্ত নিষেধাজ্ঞায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তার রেশ না কাটতেই শুরু হয় ইউক্রেন যুদ্ধ। এর মধ্যেই ৭ অক্টোবর শুরু হয়েছে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ। ভূরাজনৈতিক এসব সংঘাতের জের গিয়ে পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। সরবরাহ চেইনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শ্লথতার পেছনে এটি অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এ সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে ওসাকায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে জি৭-এর বাইরে আমন্ত্রণ জানানো হয় উন্নয়নশীল এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রতিনিধিদেরও।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে বড় ধরনের সংকটে পড়ে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত প্রযুক্তি রফতানিতে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞায় মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্যে। কম্পিউটারের চিপ ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল সরবরাহেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে নতুন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। ওসাকা বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সৃষ্ট ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, চীন বাণিজ্যকে রাজনৈতিক বলয় সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছে।

বৈশ্বিক বাজারে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির কাঁচামালের বড় অংশের সরবরাহকারী দেশ চীন। দেশটি চলতি মাসের শুরুর দিকে গ্রাফাইট রফতানিতে সীমা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে, যা আগামী ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। নিশিমুরা বলেন, ‘‌আমরা এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মোকাবেলা করছি। তবে এর মধ্য দিয়ে যেন বাণিজ্যিকভাবে রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকে না পড়ি, সেটাও ভাবতে হচ্ছে।’

সভায় জি-৭ সদস্য দেশগুলো ছাড়াও ভারত, অস্ট্রেলিয়া, চিলি, ইন্দোনেশিয়া ও কেনিয়ার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। পাশাপাশি ছিল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতোও প্রতিষ্ঠানও। বৈঠক শুরুর আগে আগে জাপান সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, বৈঠকে বাণিজ্যবিষয়ক সমস্যা চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হবে। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, যথাযোগ্য বাণিজ্য নীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ চেইনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলোও থাকবে এজেন্ডায়।

আগস্টের শেষ দিকে জাপানি সি-ফুড আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চীন। চলতি মাসে রাশিয়ার তরফেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসে। ডব্লিউটিও মহাসচিব এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলার মতে, নতুন করে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নানা সমীকরণ স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

দিল্লিতে গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত জি২০ সম্মেলনেও সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর দেয় জোটের সদস্য দেশগুলো। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড বলছে, বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতার ফলে আগামী দিনগুলোয় মূল্যবান উপাদানগুলোর দাম আরো বেড়ে যাবে। সরবরাহ চেইন সীমিত হয়ে পড়ায় সংকুচিত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পূর্বাভাস দিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিভাজন বিশ্বজুড়ে জিডিপি ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত করতে পারে।