উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নাকাল বৈশ্বিক অর্থনীতি। চলতি বছরে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সে ক্ষত আরো দীর্ঘ হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হলো সম্প্রতি প্রকাশিত রয়টার্সের জরিপে। পাশাপাশি থাকবে উচ্চ সুদহার দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি।
রয়টার্সের এ জরিপ পরিচালনা করা হয় ৬-২৫ অক্টোবরের মধ্যে, যেখানে অংশগ্রহণ করেন ২২৮ জন অর্থনীতিবিদ। তাদের তিন-চতুর্থাংশের দাবি ছিল, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি থাকবে। তাছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে উচ্চ সুদহারের প্রবণতা। এর আগে বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার কমাতে শুরু করতে পারে। কিন্তু সে পূর্বাভাস থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন তারা। বরং তারা মনে করছেন, সুদহার নিম্নমুখী হতে পারে আগামী বছরের দ্বিতীয়ার্ধে কিংবা শেষ নাগাদ।
পূর্বাভাসের এ পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছিল, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে খুব শিগগির। আর যেহেতু বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার পরিবর্তনে ফেডের সিদ্ধান্ত ভূমিকা রাখে, ফলে বিশ্বব্যাপী সুদহারের গতিমুখও নির্ধারণ হবে দ্রুত সময়েই। এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর অপেক্ষা দীর্ঘ হতে চলছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে কিছুটা সফলতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্য এখনো অধিকাংশ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। আর মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রায় আনাটা তাদের কাছে এখন পর্যন্ত কঠিন পর্যায়েই রয়েছে।
জরিপে অংশ নেয়া ৭৫ শতাংশ বিশ্লেষকের দাবি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকবে বিশ্বব্যাপী। এর আগে বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। দেশটির অপ্রত্যাশিত সম্প্রসারণকে কিছুটা ব্যতিক্রম হিসেবেই দেখা হচ্ছে। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশটি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে তুলনামূলকভাবে গতিশীল রেখেছে।
ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই উচ্চ সুদহার দীর্ঘ হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাও তাদের পূর্বাভাসে বিশ্বাস করেছে। কানাডাভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বিএমওর প্রধান অর্থনীতিবিদ ডগলাস পোর্টার বলেন, ‘সম্ভবত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ এরপর আর বাড়ানো হবে না। কিন্তু এত কিছুর পরও আরো এক দফা বাড়ানোর সম্ভাবনাকে নাকচ করা যায় না। বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আনাটাও বিস্ময়ের কিছু হবে না।’
গত মাসের জরিপে প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থনীতিবিদ অভিমত দেন, সুদহার আগামী বছরের মাঝামাঝি কমানো হতে পারে। সর্বশেষ জরিপে তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। নিউজিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর মধ্যেই সুদহার কমানোর আগে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছে।
অধিকাংশ বিশ্লেষক পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০২৪ সালের প্রথম দিকে কোনো প্রকার সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত আসবে না। রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া, ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া ও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার জন্য এ সম্ভাবনা আরো বেশি দৃঢ়। এমনকি ব্যাংক অব জাপানও নড়েচড়ে বসতে পারে সুদহারবিষয়ক সিদ্ধান্তে। দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার ঋণাত্মক পর্যায়ে রেখেছিল, সে সিদ্ধান্তের সমাপ্তি ঘটতে পারে।
বিশ্লেষকদের দাবি, সুদহারে পরিবর্তন আনার বড় অংশই মূল্যস্ফীতির ওপর নির্ভর করবে। পাশাপাশি রয়েছে দেশে দেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আগের পূর্বাভাসে ২ দশমিক ৯ শতাংশে থাকার কথা বলা হয়েছিল। ফলে এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে নিয়ন্ত্রণে আনাটা যথেষ্ট কঠিন।
সিটি গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ নাথা শিটস বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতির কারণে উচ্চ সুদহার ধরে রেখেছে। এটা আরো দীর্ঘ হবে। যতদিন না বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক পর্যায়ে আসে।’










