সাধারণভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ভাষায় ব্যর্থতা মানেই লোকসান, বাজার হারানো কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত। কিন্তু সে ধারণা ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে একসময়ের সম্ভাবনা তৈরি করা উদ্ভাবনগুলোর মাধ্যমে। বড় ব্র্যান্ডের ব্যর্থতা এখন শুধু অতীতের ভুল নয়; বরং শেখার উপকরণ, আলোচনার বিষয়ও। আবার কখনো কখনো এটিও হয়ে উঠতে পারে পূর্ণ বাজার। এমন বাস্তবতার প্রতীক হিসেবেই যুক্তরাজ্যে আসছে ‘মিউজিয়াম অব ফেইলিউর’, যেখানে ব্যর্থতাই মূল কনটেন্ট।
ভ্রাম্যমাণ এ প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য হলো ব্যর্থ পণ্য, প্রকল্প ও নীতিগত সিদ্ধান্তকে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা। টিকিট বিক্রি, করপোরেট ওয়ার্কশপ ও আলোচনা সভার মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতাভিত্তিক ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যর্থতা এখানে লজ্জার বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বোঝার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে এ প্রদর্শনী।

প্রদর্শনীর তালিকায় রয়েছে টাইটানিক, সিনক্লেয়ার সি-ফাইভ, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার আইটি প্রকল্প, ডাইসন জোন, অ্যামস্ট্রাড ও দ্য বডি শপের মতো পরিচিত নাম। এমনকি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উদাহরণ হিসেবে ব্রেক্সিটও রয়েছে। এসব ঘটনা শুধু আলাদা ভুলের ফল নয়। এগুলোর পেছনে ছিল বড় অংকের বিনিয়োগ, নীতিগত সিদ্ধান্তের ঝুঁকি এবং বাজার সম্পর্কে ভুল ধারণা। বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যর্থতার ইতিহাস বোঝা মানে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তে ঝুঁকি কমানো। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যর্থতার তথ্য ও অভিজ্ঞতাও এখন ব্যবসায়িক সম্পদ হিসেবে আমলে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।
প্রদর্শনীতে এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্য শুরুতে ব্যর্থ হলেও পরবর্তী প্রযুক্তির পথ তৈরি করেছে। যেমন অ্যাপল নিউটন বা গুগল গ্লাস।
স্টার্টআপ অর্থনীতিতে ব্যর্থতার বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪২ শতাংশ স্টার্টআপ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে না। তবে দেশভেদে এ ব্যর্থতাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যর্থতাকে অনেক সময় ভবিষ্যৎ সাফল্যের একটি ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীনে আবার ব্যর্থ পশ্চিমা পণ্যগুলোকে ব্র্যান্ডিং দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ঝুঁকিবিমুখ অর্থনীতিতে ব্যর্থতাকে ইতিবাচকভাবে দেখার ধারণা এখনো সহজে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এ সাংস্কৃতিক পার্থক্যই আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
তবে ব্যর্থতাকে অতিরিক্ত ইতিবাচকভাবে দেখার ঝুঁকিও রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশ বা অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অর্থ শুধু ব্যবসা গুটিয়ে ফেলা নয়; অনেক সময় তা জীবিকা, পরিবার ও সামাজিক নিরাপত্তা হারানোর সঙ্গে জড়িত। ফলে ব্যর্থতা শেখার বিষয় হলেও এর আর্থিক ও সামাজিক খরচ উপেক্ষা করা যায় না।
ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী ‘মিউজিয়াম অব ফেইলিউর’ আগামী বসন্তে যুক্তরাজ্যে আসছে। তবে এখনো ভেন্যু বা সময়কাল চূড়ান্ত হয়নি। এর আগে বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হলেও যুক্তরাজ্যকে প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে দেখছেন আয়োজকরা। —সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান









