মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দার ঝুঁকি বাড়ছে। এর মধ্যেই ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে এর প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে রয়েছে ইরান ও সৌদি আরবের মতো জ্বালানি তেলের উৎস। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি, বাব-এল মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো সংযোগপথ। আবার বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ এখান থেকেই যায়। অঞ্চলটিতে শুরু হওয়া সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাতে যাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী মন্দা দেখা দেয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইসরায়েল ও হামাসের সংঘাতে দুই পক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার অতিক্রম করেছে। গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নড়েচড়ে বসেছে লেবাননভিত্তিক সংগঠন হিজবুল্লাহ। হামাসকে আর্থিক ও অস্ত্রের মাধ্যমে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ইরান। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিতে গড়িয়েছে। যদি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত ঘটে, তাহলে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মূল্য ১৫০ ডলারে উন্নীতি হতে পারে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসবে ১ দশমিক ৭ শতাংশে।
বিশ্বনেতাদের পক্ষ থেকে মন্তব্য এলেও যুদ্ধ বন্ধের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সংঘাতের ক্ষত আরো দীর্ঘ হবে। এর আগে ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সে পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। অন্য অনেক অঞ্চলের সংঘাতের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষত ঠিক হয়নি। এ মুহূর্তে নতুন করে উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য শুভ সংকেত না। আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে জ্বালানি তেলের দাম।
২০১৪ সালে সংঘাত ফিলিস্তিনি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। নিহতের সংখ্যা ছিল দুই হাজার। তার পরও জ্বালানি তেলের ওপর প্রভাব পড়েছিল। এবার নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। ইরানের যুক্ত হওয়াও ক্ষতিকর। চলতি বছরেই তেহরান জ্বালানি তেলের উৎপাদন দৈনিক সাত লাখ ব্যারেল বাড়িয়েছে। যদি সংঘাতের কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে প্রতি ব্যারেলে ৩-৪ ডলার বাড়বে দাম। এদিকে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাতের প্রভাবও যে কম নয়, তার উদাহরণ ২০০৬ সালে দেখা গেছে। তখন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৫ ডলার বেড়ে গিয়েছিল।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইউরোপীয় পুঁজিবাজারে শেয়ারের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। দাঁড়িয়েছে সাত মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে। ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে উচ্চ সুদহারের ঝুঁকি। মানিফার্মের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা রিচার্ড ফ্ল্যাক্স বলেন, ‘ভূরাজনীতির কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগকারীদের ওপর। বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম, যা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।’
সংঘাতের সূত্র ধরে এশিয়ার বিভিন্ন পুঁজিবাজারেও শেয়ারমূল্য ১১ মাসের সর্বনিম্নে এসে ঠেকেছে। এলপিএল ফাইন্যান্সিয়ালের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কুইন্সি ক্রসবি বলেন, ‘আমরা এখন কেবল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলছি না। নতুন ফ্রন্ট হিসেবে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যও।’
ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর তা হলে কেবল মূল্যস্ফীতি না, প্রবৃদ্ধিতেও পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।










