ভোক্তা চাহিদার নিরিখে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি লক্ষণীয়। গত এপ্রিল-জুন প্রান্তিকের জিডিপি প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে জুলাইয়ের বাণিজ্যিক চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, দেশটিতে রফতানি পূর্বাভাসের চেয়ে কমেছে। একই সময়ে দুর্বলভাবে হলেও বেড়েছে আমদানি, যা ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করছে। গতে মাসে দেশটি থেকে ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় রফতানি বেড়েছে ৭ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস ছিল, এ সময় রফতানি প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট বা ১০ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে। খবর এপি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ার বৃহত্তম এ অর্থনীতির জুলাইয়ের রফতানি-আমদানির চিত্র একাধিক বিষয় তুলে ধরে। বিশেষ করে দুর্বল রফতানিতে ভূমিকা রেখেছে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য প্রধান বাজারগুলোয় ভোক্তা চাহিদার দুর্বল প্রবৃদ্ধি। 

কভিড-১৯ মহামারীর কারণে বাকি বিশ্ব থেকে তুলনামূলক দীর্ঘ লকডাউনে থমকে যায় চীনের অর্থনীতি। এরপর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে চীনের নীতিনির্ধারকরা উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। এতে দ্রুত পুনরুদ্ধারের আশা করা হলেও পূর্বাভাসের তুলনায় শ্লথ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে দেশটিতে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে উন্নত অর্থনীতিগুলো সুদহার এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে রেখেছে। এ কারণে এসব দেশে ভোক্তা চাহিদাকে কিছুটা কম রয়েছে। 

এর আগে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) প্রবৃদ্ধি প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময় ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে চীনে, যা পূর্বাভাসের চেয়ে কম। তখন অর্থনীতিবিদরা বলেছিলেন, ভোক্তা চাহিদায় মন্দা ও সরকারি ব্যয় কমে যাওয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির প্রবৃদ্ধিকে টেনে ধরেছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক অঞ্চলে শুল্ক বাধার মতো পদক্ষেপ সামনে চীনকে ভোগাতে পারে।

প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাইয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চীনে আমদানি ৭ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২১ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার হয়েছে। এ সময় শক্তিশালী বাণিজ্য অংশীদার এশীয় দেশগুলো থেকে শিল্প সরঞ্জাম, উপকরণ ও ভোক্তা পণ্য আমদানি করেছে চীন। অন্যদিকে গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোয় চীন থেকে রফতানি বেড়েছে ১১ শতাংশ।

জুলাইয়ে চীন ৩০ হাজার ৬০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। রফতানির এ অর্থ তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন সম্প্রসারণকে তুলে ধরেছে। এ সময় দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৮ হাজার ৪৭০ কোটি ডলার। এর আগে জুনে রেকর্ড ৯ হাজার ৯১০ কোটি বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল। তবে ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় জানুয়ারি-জুলাইয়ে উদ্বৃত্ত প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। এ সাত মাসে চীনের রফতানি এক বছরের আগের তুলনায় ৪ শতাংশ বেড়েছে, তবে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম থাকায় আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এদিকে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় অংকের শুল্ক কার্যকর হওয়ায় সেপ্টেম্বর নাগাদ চীন থেকে রফতানির গতি শ্লথ হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। অবশ্য শুল্ক বাধা কার্যকর হওয়ার আগেই আমদানিকারকরা বেশি হারে চীনা গাড়ির ক্রয়াদেশ দেন। এ কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইউরোপীয় বন্দরে চীনা যানবাহনের বড় চালান দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এ অঞ্চলে চীন থেকে যানবাহন আমদানি ১৮ শতাংশ বেড়েছে। চীনের বাইরে কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে এ সংকট দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির গাড়ি কোম্পানিগুলো। তাতে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলেও ফলাফল পেতে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

গবেষণা সংস্থা ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, জুলাইয়ে চীনে আমদানি গতি বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা তুলে ধরে। এর অর্থ হলো, ভোক্তা চাহিদাকে সহযোগিতা এবং দেশটির ধসে পড়া আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।

জিচুন হুয়াং বলেন, ‘আমরা আশা করছি আগামী মাসগুলোয় চীনে আমদানির পরিমাণ আরো বাড়বে। দেশটির নীতিনির্ধারকরা কয়েক মাস আগের তুলনায় স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আরো উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে এবং ব্যয় বাড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন, যা আরো বেশি অবকাঠামো ও আবাসন নির্মাণের দিকে পরিচালিত করবে। এ কারণে শিল্পসামগ্রী সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।’