বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিভাজন বাড়ছে ভূরাজনৈতিক নানা টানাপড়েনে। বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলো। এ মেরুকরণ প্রক্রিয়া আগামী দিনগুলোয় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড। খবর নিক্কেই এশিয়া।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ৫ অক্টোবর পূর্বাভাস দিয়েছে, বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে ২০২৩ সালের প্রবৃদ্ধি থাকবে দশমিক ৮ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ হার এপ্রিলের ঘোষিত পূর্বাভাসের তুলনায় অর্ধেক। এপ্রিলে সংস্থাটি ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। পূর্বাভাসে এ অবনমনের একটি কারণ হচ্ছে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি। মহামারী-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। ইউরোপও এর বাইরে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন দেশের ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি। 

অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে বিভিন্ন দেশকে। সেভাবেই পুনর্গঠিত হচ্ছে সরবরাহ চেইন। সেমিকন্ডাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সামনে আসছে রাজনৈতিক নানা সমীকরণ। ফলে বৈশ্বিক মুক্তবাণিজ্যের পথে তৈরি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা। আঙ্কটাড বলছে, বাণিজ্যিক বিচ্ছিন্নতার ফলে আগামী দিনগুলোয় মূল্যবান উপাদানগুলোর দাম আরো বেড়ে যাবে। সরবরাহ চেইন সীমিত হয়ে পড়ার কারণে সংকুচিত হবে বৈশ্বিক অর্থনীতি। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল পূর্বাভাস দিয়েছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিভাজন বিশ্বজুড়ে জিডিপি ৭ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত করতে পারে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে কোন দেশ কোন পক্ষে ভোট দিচ্ছে, তাকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক মৈত্রী গড়ে উঠছে। ‌

বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিশেষ ধরনের এক প্রবণতা বাড়ছে। যেসব দেশ রাজনৈতিকভাবে সমমনা, সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়ানো হচ্ছে। এটি ফ্রেন্ডশোরিং নামে পরিচিত। রাজনৈতিক সমমনাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর পাশাপাশি বিপরীত প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, যেসব দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন আছে, তাদের সঙ্গে বাণিজ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। 

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতকে কেন্দ্র করে বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে রাশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। তার বদলে বেড়েছে চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক। দেশটি চীনের সঙ্গে ব্যবসা বাড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এদিকে তাইওয়ান চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। তাইওয়ান প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সৃষ্ট টানাপড়েন প্রভাবিত করেছে বাণিজ্যকে। অস্ট্রেলিয়া চীনের সঙ্গে বাণিজ্য কমিয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ।

ভূরাজনীতির দ্বারা বাণিজ্য প্রভাবিত হওয়ার সর্বশেষ উদাহরণ জাপানি সি-ফুড। চীন জাপানি সি-ফুড আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে গত আগস্টে। চলতি মাসে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাশিয়ার নাম। জাপান থেকে সব ধরনের সি-ফুড আমদানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মস্কো। ভূরাজনৈতিক নানা টানাপড়েনের মধ্যেই নতুন করে শুরু হয়েছে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ। রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে সতর্ক করেছেন ডব্লিউটিও মহাসচিব এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাতও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।