দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিংহভাগই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। যার বড় একটি অংশ আবার প্রাকৃতিক গ্যাস। ফলে তীব্র আকার ধারণ করছে গ্যাসের সংকট। সেজন্য ভবিষ্যতে টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। গতকাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এমনটা জানান তারা। ‘নেভিগেটিং এনার্জি সিকিউটিরিটি: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিস ফর সাসটেইনেবল ফিউচার অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে আইইবির যন্ত্রকৌশল বিভাগ।
বৈঠকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল অ্যান্ড মেটারিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে আমরা ভারতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি। নিজস্ব জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে পারলে আমাদের আমদানি নির্ভরতা কমবে। আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর জন্য কাজ করা হচ্ছে। গ্যাসের অনুসন্ধান চলছে। তবে এটা হয়তো আরো অনেক আগে থেকেই করা দরকার ছিল। কয়লা উত্তোলনের জন্য নীতি পরিবর্তন দরকার। দিনদিন আমাদের চাহিদা বাড়ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপরই নির্ভর করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রচুর বিনিয়োগ দরকার।’
বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা সংস্থা পাওয়ারসেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের আরো বেশি নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে। বায়ুশক্তি থেকে আমরা মাত্র ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। এরই মধ্যে জামালপুরে ২০ হাজার একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখান থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।’
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘একটা সময় বিদ্যুতের ৯০ শতাংশই নিজস্ব গ্যাস থেকে আসত। কিন্তু এখন আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ মুহূর্তে বিশ্বের ২৮ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত হয়। ২০৫০ সালে এ খাত থেকেই মোট বিদ্যুতের ৮০ শতাংশ আসবে। সে পরিকল্পনায় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। অন্যান্য দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভিন্নভাবে উৎপাদন করলেও আমাদের সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তির ওপরই নির্ভর করতে হবে। আবার আমাদের দেশের ভোক্তারা শুধু ভোক্তাই থেকে গেছে। যেখানে অন্যান্য দেশের ভোক্তারা নিজেরাও বিভিন্নভাবে উৎপাদন করে।’
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (আইপিপিসেল-৩) জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা বলেন, ‘আমরা প্রায় পুরোটাই জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ নির্ভরশীলতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে আগাতে হবে। সৌরশক্তি থেকে এরই মধ্যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।’
বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারসন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মো. সিরাজুল মওলা বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করতে পারছি না। অপরদিকে আমাদের কী পরিমাণ জ্বালানি নষ্ট হচ্ছে, সে হিসাব কেউ করছে না। ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর। যানবাহন যখন ধীরগতিতে চলে, তখন অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হয়। ট্রাফিক জ্যামের কারণে কী পরিমাণ জ্বালানি নষ্ট হয়, সে বিষয়টিও বিবেচনায় আনা জরুরি।’
বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. ওয়াসিউল হুদা বলেন, ‘সিএনজিচালিত যানবাহনে আমরা ৪ থেকে ৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করছি। কিন্তু টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতে বিকল্প শক্তির দিকে নজর দিতে হবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে সিস্টেমলস কিংবা লিকেজে নজর দিতে পারলে এ খাতের জ্বালানিকে টেকসই করতে পারব।’
গোলটেবিল বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন আইইবির যন্ত্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আহসান বিন বাশার (রিপন)। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইইবির ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান, আইইবির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী এসএম মনজুরুল হক মঞ্জুসহ আরো অনেকে।










