সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে রফতানি আদেশ আরো কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সহায়ক ও প্রবৃদ্ধিমুখী বাজেট প্রণয়নের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে করহার কমিয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে বাজেটের আওতায় নিয়ে আসার দাবি তাদের। ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক সেমিনারে গতকাল এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান। এমসিসিআই এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান ছয়টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে এনআইডি ও টিআইএন ডেটাবেজ পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূতকরণ; নতুন করদাতাদের ভীতি দূর করতে ন্যূনতম প্রতীকী কর নির্ধারণ এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা।

এছাড়া আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের জন্য আলাদা পোর্টাল না রেখে একটি সমন্বিত ‘ইউনিফায়েড করদাতা প্রোফাইল’ চালু করার দাবি জানান এমসিসিআই সভাপতি। তার মতে, এতে প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানি দুটোই কমবে। এছাড়া অনলাইন শুনানি এবং ডিজিটাল নোটিস পদ্ধতি চালু করলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ বাঁচবে।

কামরান টি রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘করপোরেট কর কমানো হলেও ‘নগদ লেনদেনের’ কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাচ্ছে না।’ অর্থনীতির বাস্তবতার নিরিখে শর্তটি বাতিলের অনুরোধ জানান তিনি।

এছাড়া তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আরো ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানো হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে বলেও দাবি করেন এমসিসিআই সভাপতি।

তিনি আরো বলেন, ‘৩৯টি ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক থাকা ব্যবসা সহজীকরণের অন্তরায়। এছাড়া আয়কর আইন ২০২৩-এর কিছু ধারা (যেমন ছয় বছরের অধিককাল সম্পদ বিবেচনা) বাস্তব অবস্থার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। ভ্যাট ও কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা যেতে পারে।’

এমসিসিআই বলছে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষায় মুসক ৪.৩ ফরমে ‘মূল্যমান’-এর পরিবর্তে শুধু ‘পরিমাণ’ উল্লেখ করার সুযোগ দেয়া হোক। কাস্টমস পর্যায়ে ডেটাবেজ মূল্যের পরিবর্তে প্রকৃত ‘লেনদেন মূল্য’ অনুযায়ী শুল্কায়ন নিশ্চিত এবং অটোমেশন প্রক্রিয়া জোরদার করা জরুরি। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিকাশে পৃথক করহার ও ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হলে দেশীয় শিল্প আরো শক্তিশালী হবে।

সেমিনারে স্কয়ার টয়লেট্রিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, ‘আমাদের সেফটি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের মতো পণ্যগুলো আমদানিনির্ভর, সেটিতে প্রায় ২৫ শতাংশ ট্যাক্স দিতে হয়, যা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা যেতে পারে।’

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘জ্বালানি সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ। ব্যাহত হচ্ছে চলমান উৎপাদন কার্যক্রমও। এখন নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি এ খাতকে আরো চাপে ফেলবে।’

কর জালের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের করের আওতায় আনার পরামর্শ দেন এপেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান গোলাম মইন উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘দেশে এখনো যারা নিয়মিত ট্যাক্স দেন তাদের ওপরই পুরো চাপ পড়ে। কিন্তু যারা দেন না তাদেরকে সিস্টেমের মধ্যে আনা হচ্ছে না, বিশেষত ভ্যাটের ক্ষেত্রে।’

সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ, বাংলাদেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি শাহাদাত হোসেন, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আখতার মালাসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।