একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) খাতে মেগাডিল বা বিশালায়তনের চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যমানের চুক্তিকে। চলতি ২০২৫ সাল শেষ হতে এখনো এক মাসেরও বেশি সময় বাকি। যদিও এরই মধ্যে মেগাডিলের সংখ্যার দিক থেকে অতীতের যেকোনো বছরকে ছাড়িয়ে গেছে ২০২৫ সাল। খবর এফটি।
সর্বশেষ গত বুধবার ১ হাজার ৩০ কোটি ডলারের সমমূল্যে দক্ষিণ কোরিয়ার বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ আপবিটকে অধিগ্রহণ করে নেয় দেশটির শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি নেভার। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছর বিশ্বব্যাপী এমঅ্যান্ডএ খাতে মেগাডিলের মোট সংখ্যা ৬৩-তে দাঁড়িয়েছে বলে বাজার তথ্যসেবা সংস্থা এলএসইজির পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। সংস্থাটি এমঅ্যান্ডএর তথ্য সংকলন ও পরিসংখ্যান তৈরি করছে ১৯৮৮ সাল থেকে। আপবিট অধিগ্রহণ চুক্তির মাধ্যমে মেগাডিলের সংখ্যার দিক থেকে চলতি বছর ২০১৫ সালের রেকর্ডকে ভেঙে ফেলেছে বলে এলএসইজির তথ্যে উঠে এসেছে।
যদিও চলতি বছরের শুরুটা এমঅ্যান্ডএ খাতের জন্য বেশ প্রতিকূলই ছিল। বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) মার্কিন শুল্কনীতি ও সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগেছে খাতটি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) এমঅ্যান্ডএ মেগাডিলের রীতিমতো জোয়ার তৈরি হয়। এর পেছনে বেশকিছু বিষয় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিথিল ব্যবসায়িক নীতি ও কর ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ওয়াল স্ট্রিটে ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তারা। তাদের ভাষ্যমতে, ট্রাম্পের শিথিল ব্যবসায়িক নীতি ও কর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বড় চুক্তিগুলোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে।
চলতি বছরে এমঅ্যান্ডএ মেগাডিলগুলোর সবচেয়ে বেশি সম্পন্ন হয়েছে ব্যাংক, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে। এমঅ্যান্ডএর প্রবণতা প্রধানত বড় কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সামগ্রিকভাবে এটি বাজারের পুনরুজ্জীবন ও উচ্চ মুনাফার সম্ভাবনা তুলে ধরছে বলে অভিমত অর্থনীতিবিদদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এমঅ্যান্ডএ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদারীকরণের নীতি ওয়াল স্ট্রিটকে ঝুঁকি নিতে উৎসাহ দিচ্ছে। এটি একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী বড় ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পাদনের প্রবণতাকেও উসকে দিচ্ছে। ফলে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের লেনদেনের সংখ্যায় রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
গত এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক ঘোষণা করেন। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার কমানোর পদক্ষেপ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে অনুকূল নীতি, নিরাপদ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজারের চাপ—এসবের সমন্বিত প্রভাবে বড় চুক্তি বেড়ে যায়। ব্যাংক অব আমেরিকার মার্জারস অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন বিভাগের গ্লোবাল কো-হেড ইভান ফারম্যান বলেন, ‘কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের চুক্তি করতে চেয়েছিল এবং এর বাজারও প্রত্যাশা করছিল। বড় লেনদেনের দিকে এগোতে কোম্পানিগুলো সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।’
তার মতে, এ ধরনের একটি চুক্তি সই হওয়ার পর তা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বীদের এমঅ্যান্ডএ নিয়ে আরো উৎসাহী করে তোলে। কারণ কেউই ব্যবসায় পিছিয়ে থাকতে চায় না।
মূলত চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধেই এমঅ্যান্ডএ চুক্তি খাতে বড় উত্থান ঘটেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিইওরা এমন সব বড় চুক্তির দিকে এগোচ্ছেন, যা জীবনে একবারই করার মতো সুযোগ আসে।
চলতি বছর এমঅ্যান্ডএ খাতের সবচেয়ে বড় মেগাডিলটির আকার ছিল সাড়ে ৮ হাজার কোটি ডলার। এ মূল্যে মার্কিন রেলওয়ে কোম্পানি নরফোক সাউদার্নের মালিকানা কিনে নেয় প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিয়ন প্যাসিফিক। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি সার্বভৌম তহবিল সমর্থিত কনসোর্টিয়ামের ৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে ভিডিও গেম নির্মাতা ইলেকট্রনিক আর্টস (ইএ) অধিগ্রহণের চুক্তি। পরের অবস্থানে রয়েছে ৫ হাজার কোটি ডলারে খনি জায়ান্ট টেকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাংলো আমেরিকানের একীভূতকরণ এবং ৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের ওষুধ প্রস্তুতকারক কেনভুকে কিম্বার্লি-ক্লার্কের অধিগ্রহণের চুক্তি।
আইনি সংস্থা কার্কল্যান্ড অ্যান্ড এলিসের করপোরেট পার্টনার এডওয়ার্ড লির মতে, সুদহার-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কারণে দুই বছর ধরে এমঅ্যান্ডএ কার্যকর করা স্থগিত রেখেছিল বড় কোম্পানিগুলো। এখন ডিরেগুলেশনের কারণে নিয়ন্ত্রণমূলক বাধায় আটকে থাকা চুক্তিগুলোও সম্পন্ন করা সহজ হয়ে এসেছে। বিভিন্ন কোম্পানির সিইও ও বোর্ড সদস্যরা এ ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপের অনুকূল পরিবেশ দেখছেন।
মূলত চীনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছু হটার পর মেগাডিল বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে এমঅ্যান্ডএ-বান্ধব নীতি গ্রহণের প্রতিও জোর সমর্থন রয়েছে তার। এর মধ্যে অন্যতম হলো অ্যান্টিট্রাস্ট নিয়ম শিথিলকরণ।
আইনি সংস্থা পল ওয়েইসের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের কো-হেড কৃষ্ণা ভিরারাঘবন বলেন, ‘বর্তমান নিয়ন্ত্রক পরিবেশ থেকে কোম্পানিগুলো ভাবছে, বড় পরিসরের লেনদেন করার সুযোগ রয়েছে, যা হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না।’
এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রমে ঝুঁকি গ্রহণের মনোভাব এখন বিভিন্ন খাতেই দেখা যাচ্ছে। ব্যাংক খাতে এ ধরনের চুক্তি অনুমোদন এখন তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম গতিতে পাওয়া যাচ্ছে। বড় ফার্মাগুলো নতুন ওষুধ তৈরি করতে বায়োটেক কোম্পানি কিনে নিচ্ছে। অন্যদিকে এআইয়ের উত্থানে প্রযুক্তি ও ডাটা সেন্টারে নতুন চুক্তিও বাড়ছে। সিটিগ্রুপের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের গ্লোবাল কো-হেড দ্রাগো রাজকোভিক বলেন, ‘শুধু এআই-কেন্দ্রিক প্রযুক্তি নয়; স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, আর্থিক ও অন্যান্য খাতেও এমঅ্যান্ডএ চুক্তি বাড়ছে।’
তবে এমঅ্যান্ডএর এ জোয়ারে বড় কোম্পানির তুলনায় ছোট কোম্পানিগুলো বেশ পিছিয়ে। এ বিষয়ে বার্কলেসের এমঅ্যান্ডএ বিভাগের গ্লোবাল হেড এন্ড্রু ওয়েবার বলেন, ‘ছোট চুক্তি করা প্রায়ই কঠিন। বাজারে এসব কোম্পানির বড় প্রভাব না থাকায় এগুলো ক্রেতাদের কাছে কম আকর্ষণীয়। মূল বিষয় হলো ছোট চুক্তির রিটার্নও কম। তাই আমাদের গ্রাহকরা বড় লেনদেনে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।’










