রাশিয়ার সম্ভাব্য ইউক্রেন দখল আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারের জন্য বড় ধরনের হুমকি বয়ে আনতে পারে। দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি পণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উত্তেজনা আরো বাড়লে শেয়ারবাজারগুলোয় দরপতন ঘটতে পারে। অন্যদিকে ঊর্ধ্বমুখী পণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। খবর সিএনবিসি।

এদিকে রাশিয়ার প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে মার্কিন প্রশাসন। ইউক্রেনে হামলা অথবা দখলের চেষ্টা চালালে দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও রাশিয়া বলছে, ইউক্রেন দখলের কোনো পরিকল্পনা নেই দেশটির। কিন্তু এমন উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কারণে পণ্যবাজারে অস্থিতিশীলতা ক্রমে তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়া হামলা চালালে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও ইউরোপিয়ান গ্যাসের দামে উল্লম্ফন দেখা দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগে ২০১৪ সালেও আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি একই রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল। কারণ ওই বছর রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপটি দখল করে নেয়। তবে বিশ্ববাজারে এ ঘটনার প্রভাব বেশি দিন ছিল না। তবে বর্তমানে বাজার পরিস্থিতি যে অনিশ্চয়তার দিকে হাঁটছে, তাতে অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।

তথ্য বলছে, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে সৈন্য মোতায়েন করে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা ঠেকাতেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। এ খবর প্রকাশের পর পরই ইউরোপের পুঁজিবাজারে ধস নামে। দরপতনের হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ, যা গত বছরের অক্টোবরের পর সর্বনিম্ন।

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলিমা ক্রফট সিএনবিসিকে জানান, যদি রাশিয়ান ট্যাংক ইউক্রেনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যরেলপ্রতি ১০০ ডলারের গণ্ডি ছাড়াবে। প্রভাব পড়বে ইউরোপিয়ান গ্যাস ও আন্তর্জাতিক গমের বাজারেও।

রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ গম রফতানিকারক। এক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে ইউক্রেনের হিস্যাও অনেক বেশি। গমের বৈশ্বিক রফতানি বাজারে দেশ দুটি সম্মিলিতভাবে ২৯ শতাংশ অবদান রাখে। সংঘাত তীব্র হলে এ অঞ্চল থেকে কৃষিপণ্যটির সরবরাহ ব্যাহত হবে। ফলে পণ্যটির দাম লাগামহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

এর বাইরে অ্যালুমিনিয়াম, প্যালাডিয়াম, নিকেল ও সারের অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক রাশিয়া। দেশটি যদি পটাশের সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তবে খাদ্যপণ্যের দামে উল্লম্ফন দেখা দিতে পারে। কারণ সার সংকট দেখা দিলে শস্য উৎপাদন তলানিতে ঠেকতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতি আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।

এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের বাজারে ইউক্রেন সংকটের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানায়, জানুয়ারিতে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক গড় মূল্যসূচক বেড়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ।

বন্ড মার্কেটের জন্য অত্যন্ত হতাশার মাস ছিল জানুয়ারি। এরই মধ্যে মার্কিন ফেডারেল ব্যাংক মুনাফার হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে পারে বলে প্রাথমিক সতর্কতা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডে মুনাফার হার জানুয়ারিতে ২ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় জার্মানিতে একই বন্ডের মুনাফার হার দুই বছরের সর্বোচ্চে উঠে এসেছে।

বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে এসব বন্ড ধরে রাখেন। কারণ এগুলো নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বিনিয়োগকারীরা ইউক্রেনে হামলার আশঙ্কায় বন্ডে ক্রয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

এদিকে বন্ডের পাশাপাশি স্বর্ণও নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম একটি মাধ্যম। ইউক্রেন সংকট চরম আকার ধারণ করায় জানুয়ারির শেষ দিকে মূল্যবান ধাতুটির দাম দুই মাসের সর্বোচ্চে উঠে এসেছে।

রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি উৎপাদক। প্রতিদিন দেশটি প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি রফতানি করে। ইউরোপ স্থানীয় চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ প্রাকৃতিক গ্যাসই রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করে।

রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ শুধু নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন দিয়েই নয়, বরং ইউক্রেন হয়েও আসে। যদি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার বিরোধ আরো প্রকট হয়, তবে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ থেমে যেতে পারে। ফলে অঞ্চলটির পরিকাঠামো ভয়াবহ ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারে।

এরই মধ্যে উদ্বেগ ও সংঘাতের কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়েছে, যা সাত বছরের সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ইউরোপের বাজারে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ২৫ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারদরের তুলনায় অন্তত পাঁচ গুণ বেশি।