ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবসহ বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা জ্বালানি তেলের ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে। পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা প্রবৃদ্ধি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন সংশ্লিষ্টরা। গত দুই মাসে জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক প্রাক্কলিত চাহিদা প্রবৃদ্ধির হার অব্যাহতভাবে কমিয়েছে। তবে সম্প্রতি বাজার পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে মোড় নিয়েছে। এতে চলতি মাসে চাহিদা প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস স্থিতিশীল রেখেছে ওপেক।

সম্প্রতি মাসভিত্তিক জ্বালানি তেলের বাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে জোটটি জানায়, চলতি বছর পণ্যটির বৈশ্বিক চাহিদা দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল করে বাড়বে। বার্ষিক চাহিদার পরিমাণ দাঁড়াবে ১০ কোটি ৩ লাখ টনে, যা ২০১৯ সালের তুলনায় দৈনিক ১০ লাখ টন বেশি। অর্থাৎ বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও চাহিদা মহামারীপূর্ব অবস্থার তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।

ওপেক জানায়, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। চাহিদার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দৈনিক ৫২ লাখ ব্যারেলে। মূলত কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আরোপিত বিধিনিষেধ উঠে যেতে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত প্রসার ঘটেছে। এটিই চাহিদা প্রবৃদ্ধিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত (ওইসিডি) দেশগুলোয় চাহিদা ছিল অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকে ওইসিডি দেশগুলোয় জ্বালানি তেলের চাহিদা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল করে বেড়েছে। নন-ওইসিডি দেশগুলোয় বেড়েছে দৈনিক ১৯ লাখ ব্যারেল করে।

তবে বছরের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে চাহিদা পূর্বাভাস আবারো কমানো হতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও অন্যান্য ইস্যু জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তা কমাতে সহায়তা করছে। এর মধ্যে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি অন্যতম।

তথ্য বলছে, গত মাসে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ আগের মাসের তুলনায় প্রায় দৈনিক দেড় লাখ ব্যারেল করে কমেছে। গড় সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে।

জোটটির মাসভিত্তিক জ্বালানি তেলের বাজার প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে, মে মাসে ওপেকের সদস্য দেশগুলোয় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন দাঁড়িয়েছে গড় দৈনিক ২ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে। এক মাসের ব্যবধানে উত্তোলন প্রায় দৈনিক ১ লাখ ৭৬ হাজার ব্যারেল করে কমেছে। জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুধু সৌদি আরবে উত্তোলন বেড়েছে। অন্যদিকে জোটের মোট উত্তোলন কমার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে লিবিয়া।

সৌদি আরবে উত্তোলন দৈনিক ৬০ হাজার ব্যারেল করে বেড়েছে। মোট দৈনিক উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার ব্যারেলে। অন্যদিকে লিবিয়ার উত্তোলন দৈনিক ১ লাখ ৮৬ হাজার ব্যারেল করে কমেছে। উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দৈনিক ৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে। মে মাসে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল উত্তোলনে ওপেকের হিস্যা দশমিক ১০ শতাংশ কমেছে। হিস্যার হার দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশে।  

এদিকে জুলাই ও আগস্টে মাসভিত্তিক উত্তোলন বৃদ্ধির হার আরো বাড়ানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে ওপেক প্লাস। মূলত ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান পরিচালনার কারণে রুশ জ্বালানি তেল বাণিজ্যে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কাটাতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির পরিমাণ দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার ব্যাপারে একমত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

জুলাই ও আগস্টে ওপেক প্লাসের দৈনিক অপরিশোধিত তেল উত্তোলন ৬ লাখ ৪৮ হাজার ব্যারেল করে বাড়ানো হবে, যা আগের ৪ লাখ ৩২ হাজার ব্যারেলের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি।