চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি নির্মাণকারী দেশ ভারত। মারুতি সুজুকি দেশটির বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি। গত দশকে জেনারেল মোটরস, ফোর্ড ও ফিয়াটের মতো জায়ান্ট কোম্পানি নানা ব্যবসায়িক জটিলতায় ভারত থেকে নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ভারতের শীর্ষ কোম্পানি মারুতি সুজুকির সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে হুন্দাই। ফলে স্থানীয় বাজারে গাড়ি বিক্রির দিক থেকে এখন ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে হুন্দাই। খবর নিক্কেইএশিয়া।
ভারত থেকে গাড়ি রফতানিতে অন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে গেছে হুন্দাই। গত ২০ বছরে দক্ষিণ কোরীয় গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিটি বিশ্বের ১৫০ দেশে ভারতে তৈরি ৩৬ লাখ গাড়ি রফতানি করেছে, যা অন্য যেকোনো কোম্পানির চেয়ে বেশি। এর বেশির ভাগ রফতানি হয়েছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়।
একই সঙ্গে ভারতও উত্তর আমেরিকার পর হুন্দাইয়ের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির মূল দেশ দক্ষিণ কোরিয়া তৃতীয় অবস্থানে আছে।
নমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অটো রিটেইল কনসাল্টিং প্র্যাকটিসের প্রধান হর্ষবর্ধন শর্মা বলেন, ‘ভারতীয় ভোক্তারা পণ্যের গুণগত মানকে সবসময় গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলতে হুন্দাই এ জায়গায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে।’
সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ভারতীয় পুঁজিবাজার থেকে মূলধন আহরণের পরিকল্পনা করছে হুন্দাই। এরই মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আহ্বানের প্রক্রিয়াও শুরু করেছে কোম্পানিটি। এর অংশ হিসেবে গত মাসে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জেস বোর্ড অব ইন্ডিয়ার (এসইবিআই) কাছে কোম্পানিটির খসড়া বিবরণী দেয়া হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি ডলার তুলতে পারে কোম্পানিটি। বাস্তবায়ন হলে এটি হবে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিওর ঘটনা, এতে হুন্দাইয়ের বাজারমূল্য হবে ১৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
হুন্দাই জানিয়েছে, তারা সবসময় স্থানীয় জনশক্তি ও কাঁচামাল ব্যবহার করেছে, এতে গাড়ি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়। বিবরণী থেকে জানা যায়, বর্তমান কোম্পানিটির ৯০ ভাগ যন্ত্রাংশ তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে অবস্থিত উৎপাদন কেন্দ্র থেকে আসে। এছাড়া ভারতজুড়ে আরো ১৯০ সরবরাহকারী আছে। হুন্দাই বলছে, এর ফলে তাদের সরবরাহ চেইন ব্যয়সাশ্রয়ী ও কার্যকর, যা মুনাফা অর্জন ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে।
হুন্দাই প্রতিনিয়ত তাদের গাড়ির মডেল হালনাগাদ করে থাকে। স্থানীয় প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে কোম্পানিটি ভারতের বাজারে প্রথম হ্যাচব্যাক ও এসইউভি নিয়ে আসে, যা মার্কিন বা জাপানের কোম্পানিগুলোর চেয়ে তাদের আলাদাভাবে পরিচিত করেছে।
হ্যাচব্যাকের প্রারম্ভিক মডেল হিসেবে বাজারে নিয়ে এসেছিল সান্ত্রো। গাড়িটিতে মারুতির চেয়ে উঁচু হেডরুম (মাথার ওপরের ফাঁকা জায়গা) আছে। এছাড়া পাওয়ার স্টিয়ারিংয়ের কারণে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। একই সঙ্গে আকার ছোট হওয়ায় এর দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর ব্যয়বহুল সেডান গাড়ি ভারতীয় ভোক্তাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। সান্ত্রো বাজারে ছাড়ার ২০ মাসের মধ্যে প্রায় এক লাখ ইউনিট বিক্রি হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণে ১৯৯৮ সাল থেকে ভারতীয় অভিনেতা শাহরুখ খানকে অন্যতম ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে হুন্দাই।
গবেষণা সংস্থা মিলেস্ট্র্যাট অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড রিসার্চ গুরুগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ভিনয় পিপারসানিয়া বলেন, ‘সান্ত্রো আধুনিক ও অপেক্ষাকৃত ভালো ডিজাইনের। এটি উন্মোচনের মাধ্যমে নিজেদের পোর্টফোলিও সমৃদ্ধ করেছে হুন্দাই। ভারতীয় গাড়িপ্রেমীরা এত দিন মারুতির বাইরে ভিন্ন কিছুই চেয়েছেন।’










