এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে স্পট মার্কেট থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার দিকে ঝুঁকছে। উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিটির অস্থিতিশীল দাম থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পদক্ষেপের ফলে এক দশক ধরে জ্বালানিটির স্পট মার্কেট বাণিজ্যে ঊর্ধ্বমুখী যে প্রবণতা ছিল, তা কমতে পারে।
রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ও কম মজুদ ইউরোপকে স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড পরিমাণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বাধ্য করছে। এ কারণে চলতি বছরের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চে উঠে আসে। ফলে বিশ্বজুড়ে ক্রেতাদের মাঝে জ্বালানি সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা চরমে।
কয়েক বছর ধরেই প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে বিনিয়োগ কম। এর অর্থ হলো বাজারে নতুন সরবরাহ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এদিকে গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে অনেক দেশ কয়লা থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। এ কারণে রাশিয়ান সরবরাহও ঝুঁকির মুখে।
ওয়ার্ল্ড গ্যাস কনফারেন্সে নরওয়েজিয়ান বহুজাতিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইকুইনর এএসএর প্রাকৃতিক গ্যাস মার্কেটিং ও ট্রেডিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পেডার জরল্যান্ড বলেন, দুই বছর আগে বিশ্ববাজারে গ্যাসে যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, বর্তমানে তা অনেক বেড়েছে। ফলে জ্বালানি সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেশির ভাগ ক্রেতাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
তিনি আরো জানান, পাইপলাইনের মাধ্যমে ও এলএনজি আকারে গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ক্রেতারা ৫-১০ বছর মেয়াদি চুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। অন্যদিকে এশিয়ান ক্রেতাদের কাছে ১৫-২০ বছর মেয়াদি চুক্তি বেশি আকর্ষণীয়।
তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বরে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে দাম ৫০ শতাংশ কমেছে। গত বছরের মে মাসের তুলনায় দাম এখনো প্রায় তিন গুণ বেশি। বৈশ্বিক সংকটে দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কারণ ইউরোপিয়ান ক্রেতারা ইউক্রেন সংঘাতে রাশিয়ান গ্যাসের পরিবর্তে অন্যান্য উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, আগামী দিনগুলোয়ও বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে। ইউরোপের বাজারে রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া ও আবহাওয়া পরিস্থিতি এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবে। এতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে স্পট মার্কেটে ক্রেতারা সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছেন।
সান্তোস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেভিন গ্যালাহার বলেন, বাজারে অতিরিক্ত এলএনজির ব্যাপক চাহিদা। আমার মনে হয়, বাজার যখন অস্থিতিশীল থাকে, একটি নির্দিষ্ট দামে রাজি হওয়া দুই পক্ষের জন্য কঠিন। কারণ ক্রেতা সবসময় বলবে, এটি অস্বাভাবিক দাম। অন্যদিকে বিক্রেতারা বলবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটাই স্বাভাবিক।
প্রসঙ্গত, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে রাশিয়া থেকে। কিন্তু দেশটি ইউক্রেনে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ইইউ ও পশ্চিমা দেশগুলো। রাশিয়ার অর্থ ব্যবস্থার ওপর দেয়া হয়েছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। যদিও রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর এখনো কোনো বৈধ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে দেশটির ওপর থেকে জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে চায় ইইউ। এ কারণেই জ্বালানি বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বিকল্প উেসর শরণাপন্ন হচ্ছে। দ্রুতই নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে অঞ্চলটি।
এদিকে গত মাসের শুরুতে ১০টি পয়েন্টসংবলিত একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করে আইইএ। এতে এক বছরের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হারে রুশ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি কমিয়ে আনার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে ইইউ অঞ্চলে এলএনজির চাহিদা আকাশচুম্বী। রাশিয়ার পরিবর্তে অন্যান্য দেশ থেকে এ চাহিদা পূরণের পরিকল্পনা করছে ইইউ।










