কারণ মাঠপর্যায়ে ফলাফলই সংস্কারের প্রকৃত মাপকাঠি। ব্যাংক খাতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে সংস্কারের কথা বলা হলেও ঋণখেলাপি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতে সংস্কারের কাজে নাগরিক সমাজ ভূমিকা রাখলেও বাংলাদেশে ঐক্যের অভাব রয়েছে।’

রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল ‘বার্ষিক অর্থনীতিবিদ সম্মেলন’-এর শেষ দিনে ‘রোম্যান্সিং দ্য রিফর্ম: দ্য বাংলাদেশ স্টোরি’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত এ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এছাড়া সম্মানিত প্যানেল আলোচক হিসেবে ছিলেন সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শর্তাধীন অনেক সংস্কারই পুরনো, যা অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের সময় থেকে পুনরাবৃত্ত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়ার জন্য এক ধরনের প্রক্রিয়াগত ‘খেলা’ চলে, যেখানে উভয় পক্ষের অর্থ ছাড়ের স্বার্থ কাজ করে।’

এ সময় তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ সংস্কারের মতো উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে তা দুই বছর পর বা বর্তমান সময়েই যাচাই করা সম্ভব।’

সিপিডির চেয়ারম্যান বলেন, ‘সংস্কারকে আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও ফলাফল মূল্যায়নের পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। দুই-তিন বছর পর মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা যাচাই করা উচিত।’ সংস্কারের রক্ষক হিসেবে তিনি সংসদের বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও জনগণের যৌথ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেন।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান আরো বলেন, ‘প্রকৃত সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে শক্তিশালী নেতৃত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং আন্দোলন দরকার, যেমনটি ছয় দফা কর্মসূচির ক্ষেত্রে হয়েছিল।’

তিনি উল্লেখ করেন, নব্বইয়ের দশকে বিচার বিভাগ ও বাজেট সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও তার ফলাফল মূল্যায়ন হয়নি। বর্তমানে আবারো আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হচ্ছে। একইভাবে রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট একীভূত করার প্রস্তাব নব্বইয়ের দশক, এমনকি পাকিস্তান আমল থেকে থাকলেও ২০২৬ সালে এসেও তা বাস্তবায়ন হয়নি, যা অদক্ষতা তৈরি করছে।

সিপিডির চেয়ারম্যান পারফরম্যান্স বাজেটিং চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ১৯৭০-৮০ দশক থেকেই এটি চালু থাকলেও বাংলাদেশে এখনো তা হয়নি। ফলে ব্যয়ের ফলাফল মূল্যায়ন করা যায় না।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ৫-৬ শতাংশ ব্যয়ের কথা বলা হলেও বরাদ্দকৃত ২ শতাংশও যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। এর পেছনে কার্যকর বিশ্লেষণের অভাব রয়েছে।’ এসব সমস্যাকে সংস্কারের নয়; বরং বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

অর্থনৈতিক সংস্কারকে একটি চলমান প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তী সময়ে বেসরকারীকরণ, বাজার উদারীকরণ, ভ্যাট ও ভাসমান বিনিময় হার চালুর মতো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও ডিজিটালাইজেশনও উল্লেখযোগ্য সংস্কার।’

তিনি বলেন, ‘সিভিল সার্ভিসের রাজনৈতিকীকরণের বড় নেতিবাচক ফলাফল হলো এটি বাস্তবে সংস্কারকে থামিয়ে দেয়। আমরা দেখেছি, কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র এবং ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে স্বার্থগোষ্ঠীগুলোর একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া ‘এলিট ক্যাপচার’ বিষয়টিও সংস্কারের পথে বাধা হিসেবে কাজ করে।’

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সংস্কারের প্রধান বাধা হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাব, সুরক্ষাবাদ, আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিকীকরণ এবং এলিট ক্যাপচারকে চিহ্নিত করেন, যেখানে রাষ্ট্র কখনো নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে এবং সেগুলো বন্ধ বা একীভূত করা একটি কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। অতীতে ব্যাংকিং আইনে শেষ মুহূর্তের পরিবর্তন সংস্কারকে দুর্বল করেছে এবং একই প্রবণতা পুনরায় দেখা গেছে।’

ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে সাবেক অর্থ সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘চার-পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে এক-দুটিতে রূপান্তর, সম্পদের মান যাচাই এবং ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করে পরে পাবলিক লিস্টিংয়ে আনা উচিত। যেসব ব্যাংকের নেটওয়ার্থ নেতিবাচক হয়ে গেছে, সেগুলো বন্ধ করা বা সংখ্যা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ এ সময় তিনি সিভিল সার্ভিস সংস্কারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারের জন্য আলাদা কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেন।