অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ও শীর্ষ রফতানি গন্তব্য চীন। অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর এমন কয়েকটি দেশের একটি, যারা চীন থেকে আমদানির পরিবর্তে রফতানি করে বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ার মোট রফতানি বাণিজ্যের ৩২ দশমিক ৬ শতাংশের ক্রেতা ছিল বেইজিং। আর্থিক মূল্যে এর পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৬৭৯ কোটি ডলার। তবে বিদায়ী বছরে দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ এ বাণিজ্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা বছরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল।
অস্ট্রেলিয়া সরকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করতে ২০১৮ সালে ফাইভজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রমে চীনা হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করেছিল। সেই থেকে বেইজিং-ক্যানবেরা সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। সবশেষে করোনাভাইরাসের উত্পত্তি নিয়ে চীনের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি করলে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রকাশে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও বাণিজ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়ে চীন।
বিরোধের অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া থেকে যব, তামা, কয়লা, সুতা ও গম আমদানির চালান স্থগিত করে বেইজিং। আরোপ করা হয় বাড়তি আমদানি শুল্ক। বন্ধ করে দেয়া হয় মূল্যবান কাঠ আমদানিও। ফলে অস্ট্রেলিয়ার রফতানি খাতগুলোতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
যব: গত মে মাসে বেইজিং অস্ট্রেলিয়ান যবের ওপর ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং ও ভর্তুকিবিরোধী শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছে। এ পদক্ষেপের কারণে চীনের বাজারে অস্ট্রেলীয় যবের প্রবেশাধিকার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া একটি তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, অস্ট্রেলিয়া যবে ভর্তুকি দিয়েছে। ফলে এটি চীনের দেশীয় শিল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের মতে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত (ওইসিডি) দেশগুলোর কৃষকদের কম ভর্তুকি দেয়া হয়। এরপর ক্যানবেরা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে এ বিরোধে মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জানায়।
আমিষপণ্য: চীন অস্ট্রেলিয়ার ছয়টি মাংস সরবরাহকারীদের আমদানি স্থগিত করেছিল। সম্প্রতি এটি নিষেধাজ্ঞার রূপ নিয়েছে। প্রথম পাঁচটি নিষেধাজ্ঞার জন্য চীন লেবেলিংয়ের সমস্যা ও স্বাস্থ্য ছাড়পত্রের কথা জানিয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়ার ভেড়ার মাংস রফতানিকারকরা বলছেন, তারা কভিড-১৯ বিধিনিষেধের কারণে চীনের বাজারে রফতানি করতে পারছেন না।
তুলা: অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার দুটি শিল্প গ্রুপ জানিয়েছে, চীন তার স্পিনিং মিলগুলোকে অস্ট্রেলীয় তুলার ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে প্রায় ৮ লাখ ৯৪ হাজার টন তুলা আমদানিতে কোটা রয়েছে। এর আওতায় ন্যূনতম শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ সীমার ওপরে গেলেই তুলা আমদানিতে ৪০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়তে হয়।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করছে, চীনা কর্মকর্তারা মিলারদের প্রাথমিক কোটায় অস্ট্রেলিয়ার তুলা আমদানি করতে নিষেধ করেছেন।
কাঠ: অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড, ভিক্টোরিয়া ও তাসমানিয়া থেকে কাঠ আমদানি নিষিদ্ধ করেছে চীন। এক্ষেত্রে কাঠে লম্বিকর্ন ও বুপ্রেস্টিড বিটলসের মতো জীবন্ত কীটপতঙ্গ পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে দেশটি।
কয়লা: চীনা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সভায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে অস্ট্রেলিয়া ছাড়া অন্যান্য দেশের কয়লা আমদানির পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বেইজিং অস্ট্রেলিয়ার কয়লা আমদানি বন্ধ করতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইউটিলিটিস ও ইস্পাত মিলগুলোকে মৌখিক নোটিস দিয়েছিল।
গলদা চিংড়ি: নভেম্বরে বিপুল পরিমাণ গলদা চিংড়ির চালান চীনা বিমানবন্দর ও ক্লিয়ারিং হাউজে আটকা পড়েছিল। সেগুলো চীনা কাস্টমস কর্মকর্তাদের তদারকির অপেক্ষায় ছিল। এর পরই গত মাসে অস্ট্রেলিয়ার সি-ফুড বাণিজ্য পরামর্শদাতা গ্রুপ অস্থায়ীভাবে চীনের বাজারে গলদা চিংড়ি রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে।
এছাড়া বিরোধের জের ধরে অস্ট্রেলিয়া থেকে চীনে মধু, ফলমূল, মদ ও ওষুধ রফতানি ঝুঁকিতে রয়েছে।
রয়টার্স ও এনবিসি অবলম্বনে










