ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরেছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার। গত সপ্তাহে অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী এবং সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া পণ্যগুলোর বেশির ভাগেরই দাম বেড়েছে। আনাদোলু এজেন্সির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বাজার পর্যবেক্ষকরা জানান, আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ তিন মাসের মধ্যেই সুদহার কমাতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সুদহার কমলে বন্ড, বিল ও নোটসহ বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ কমে যাবে। বিপরীতে পণ্যে বিনিয়োগ বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস (বিইএ) প্রতি মাসে প্রকৃত ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সূচক (পিসিই) প্রকাশ করে। এতে ডিউরেবল (গাড়ি, ফার্নিচার, অ্যাপ্লায়েন্স) ও নন-ডিউরেবল পণ্য (পোশাক, পাদুকা, বিনোদন) এবং সেবা খাতে একজন ব্যক্তির গড় ব্যয়ের চিত্র উঠে আসে। এ সূচককে মূল্যস্ফীতির নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করে ফেডারেল রিজার্ভ। বিইএর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে অব্যাহত কমছে এ সূচক।

অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ইনডেক্স (পিএমআই)। ফেব্রুয়ারিতে সূচকটি ৪৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে নেমেছে, যা বাজার প্রত্যাশার অনেক নিচে।

যুক্তরাষ্ট্রে সূচকটি প্রকাশ করে ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট (আইএসএম)। এতে মূলত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর উৎপাদন, নতুন ক্রয়াদেশ, কর্মসংস্থান, ডেলিভারি ও মজুদসহ সার্বিক অবস্থা নির্দেশ করে। সূচকটি ৫০ পয়েন্টের ওপরে থাকার অর্থ উৎপাদন অর্থনীতি সম্প্রসারণের মুখে আছে। এর নিচে নামার অর্থ হচ্ছে অর্থনীতির গতি নিম্নমুখী। অন্যদিকে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের প্রকাশিত কনজিউমার সেন্টিমেন্ট ইনডেস্ক ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৭৬ দশমিক ৯ পয়েন্টে নেমেছে। এসব তথ্য বিবেচনায় নিয়ে ফেড আগামী জুনের মধ্যেই সুদহার কমাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা। 

তথ্য বলছে, চিলিতে উত্তোলন বাড়ায় গত সপ্তাহে তামার দাম কিছুটা কমেছে। তবে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে বেড়েছে নিকেলের বাজারদর। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান ম্যাকোয়ারি গ্রুপ জানায়, চলতি বছর নিকেলের বৈশ্বিক বাজার অপ্রত্যাশিত ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। ইন্দোনেশিয়ায় উত্তোলনসংক্রান্ত বিধিনিষেধের আশঙ্কা এর পেছনে প্রধান কারণ হতে পারে বলে জানায় গ্রুপটি।

গত সপ্তাহে তামার দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় দশমিক ৭ ও সিসার দাম ২ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। তবে অ্যালুমিনিয়ামের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ, নিকেলের বাজারদর ১ ও দস্তার দাম দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

মূল্যবান ধাতুগুলোর মধ্যে স্বর্ণের দাম ২ দশমিক ৩ ও রুপার দাম দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে প্লাটিনামের দাম ১ দশমিক ৭ ও প্যালাডিয়ারে দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।

ঊর্ধ্বমুখিতায় গত সপ্তাহ শেষ করেছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার। ওপেক প্লাসের উত্তোলন কমানোর নীতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক নাগাদ বহাল রাখার সম্ভাবনা দাম বাড়াতে সহায়তা করেছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে ওপেক প্লাস প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন কমানোর ঘোষণা দেয়। ২০২৩ সালের মে মাসে এর সঙ্গে অতিরিক্ত আরো দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল করে কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া ওপেক প্লাসের নয় সদস্য দেশ এর বাইরে এককভাবেও উত্তোলন কমাচ্ছে। এদিকে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আরো বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কায়ও স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। উত্তোলন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় গত সপ্তাহে বেড়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও।

তথ্যমতে, গত সপ্তাহে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। নিউইয়র্ক মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জে (নিমেক্স) প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

মার্কিন ডলারের মূল্যসূচক কমে যাওয়ায় বেড়েছে কৃষি খাতের পণ্যগুলোর দাম। ভুট্টার বৈশ্বিক উৎপাদন কমে যাওয়ার পূর্বাভাসও মূল্যবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। এসব পণ্যের মধ্যে শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে গত সপ্তাহে ভুট্টার দাম ২ দশমিক ৭ ও সয়াবিনের দাম দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে যায়। তবে গমের দাম ১ দশমিক ৮ ও চালের দাম ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।

এছাড়া ইন্টারকন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জে তুলার দাম ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, কোকোর বাজারদর ১ দশমিক ১ ও কফির দাম ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। তবে চিনির মূল্য কমেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।