ইউক্রেনে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর কয়েক ধাপে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এক্ষেত্রে রুশ জ্বালানি তেল ও অর্থ খাত পশ্চিমাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এতে খাদ্যশস্য বিশেষ করে গম রফতানিতে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি। কিন্তু ব্যাংক ও অর্থ ব্যবস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে গম রফতানি ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি রাশিয়ার।  

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কৃষ্ণ সাগরীয় খাদ্যশস্য রফতানি চুক্তি সম্প্রসারণ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। চুক্তির সময়সীমা সম্প্রসারণে শর্ত বেঁধে দিয়েছে রাশিয়া। নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির খাদ্যশস্য ও সার রফতানিতে যে সমস্যা হচ্ছে তা সমাধান করলেই চুক্তি সম্প্রসারণে রাজি হবে মস্কো। 

জাতিসংঘ ‍ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় গত বছরের জুলাইয়ে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক খাদ্য সংকট মোকাবেলা করা। ১৮ মে চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তুরস্কের ইস্তানবুলে এ-সংক্রান্ত সংলাপ চলছে। 

রাশিয়ায় গত এক দশকে গম উৎপাদন ৬০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ রফতানিকারকের খেতাব পেয়েছে দেশটি। ২০২২-২৩ মৌসুমে বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ গমের বাণিজ্য হয়েছে তার ২০ শতাংশই করেছে রাশিয়া। পর্যাপ্ত সরবরাহ ও প্রতিযোগিতামূলক দাম এক্ষেত্রে দেশটিকে সহায়তা করেছে।

আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার অনেক দেশ গম আমদানিতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া ইউক্রেনসহ কৃষ্ণ সাগরীয় অন্যান্য উৎস থেকেও এসব দেশ আমদানি করে। 

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি কৃষ্ণ সাগরীয় উৎপাদন ও রফতানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ থেকে রাশিয়া শুল্ক বিভাগের তথ্য প্রকাশ করা বন্ধ করে দিয়েছে।

মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) এপ্রিলে দেয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে রাশিয়ার গম রফতানির পরিমাণ দাঁড়াবে ৪ কোটি ৫০ লাখ টনে। আগের মৌসুমের তুলনায় রফতানি বাড়বে ৩৬ শতাংশ। ২০১৭-১৮ মৌসুমে দেশটি রেকর্ড পরিমাণ গম রফতানি করেছিল। এবার সেই রেকর্ডের চেয়েও ৩৫ লাখ টন বেশি রফতানি হবে। খাদ্যশস্যের রাশিয়ান বাজার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সভেকন জানায়, ২০২৩-২৪ মৌসুমে রফতানির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৪ কোটি ৩০ লাখ টনে। 

রফতানিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে থাকবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউএসডিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ অঞ্চল সব মিলিয়ে রফতানি করবে ৩ কোটি ৫০ লাখ টন খাদ্যশস্য। 

রাশিয়ার দাবি, কৃষ্ণ সাগরীয় খাদ্যশস্য রফতানি চুক্তি শুধু ইউক্রেনকে সুফল দিচ্ছে। এটি থেকে লাভবান হতে চায় রাশিয়াও। এ কারণেই চুক্তিটি সম্প্রসারণে শর্ত বেঁধে দেয়া হয়েছে। রাশিয়া বলছে, দেশটির কৃষি ব্যাংককে আবারো সুইফট গ্লোবাল পেমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি শস্য ও সার রফতানিতে অন্য বিধিনিষেধ সরিয়ে নিতে হবে।

দেশটির অন্য শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ আবার চালু করা, বীমা ও পুনর্বীমার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়া এবং খাদ্য ও সার রফতানিসংশ্লিষ্ট রাশিয়ান বিভিন্ন কোম্পানি ও সম্পত্তি থেকে অবরোধ উঠিয়ে নেয়া।

রাশিয়ার খাদ্যশস্য বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়নি পশ্চিমারা। মূলত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে রাশিয়ান কিছু ব্যাংক, কোম্পানি ও ব্যক্তির ওপর। আর বিষয়টি রাশিয়ান শস্য রফতানি ও পেমেন্ট প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের বাধার মুখে ফেলেছে। 

ইউএসডিএর দেয়া তথ্য বলছে, বর্তমানে রাশিয়া রেকর্ড মাত্রায় গম রফতানি করছে। গত মৌসুমে গম সংগ্রহের পরিমাণও রেকর্ড স্পর্শ করে। এর পরও ২০২২-২৩ মৌসুম থেকে দেশটিতে গমের মজুদ থাকবে ৩০ বছরের সর্বোচ্চে।

২০২১-২২ বিপণন মৌসুমে রাশিয়ার গম রফতানি কমে পাঁচ বছরের সর্বনিম্নে নেমে গিয়েছিল। রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ টনে। ওই মৌসুমের শেষ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় রফতানি তলানিতে নামে। ওই সময় ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করতে অনীহা দেখা দেয়। পাশাপাশি রফতানি শুল্কও রফতানির জন্য ইতিবাচক হয়ে ওঠে। 

এদিকে গত বছরের জুলাই ও নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন রাশিয়া কৃষিপণ্য পরিবহনসংক্রান্ত লাইসেন্সের অনুমোদন দেয়। বীমা ও অন্যান্য সেবার ক্ষেত্রেও একই নীতি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া রাশিয়ার কৃষিপণ্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয় বলেও নিশ্চিত করা হয়।

বর্তমানে রেলওয়ে ওয়াগন একটি বড় লজিস্টিক্যাল বাধা। মিলিটারি অভিযানের কারণেই এ প্রতিবন্ধকতা বেড়েছে। রাশিয়ার সরকার এরই মধ্যে রফতানি কোটা আরোপ করেছে। গম ও অন্যান্য শস্যের ওপরও বেঁধে দেয়া হয়েছে রফতানি শুল্ক। উদ্দেশ্য স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। রাশিয়ার সরকার বেশ কয়েকবার রফতানিকারকদের একটি ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে কৃষকদের উপার্জন বাধাগ্রস্ত না হয়। 

এদিকে বিশ্বের অনেক বড় শস্য ব্যবসায়ী নতুন মৌসুম থেকে (জুলাইয়ে শুরু) রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছে, রফতানিতে চ্যালেঞ্জ অব্যাহত বাড়ছে।