বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তির নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবহার নিশ্চিত করতে একজোট হয়েছে মাইক্রোসফট ও এরিকসনসহ শীর্ষস্থানীয় ১৫টি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। গত সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ট্রাস্টেড টেক অ্যালায়েন্স’ নামে একটি নতুন জোটের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। খবর রয়টার্স।

জোটের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি কোথায় বা কোন দেশে তৈরি হয়েছে, তা বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট পাঁচটি মূলনীতির ভিত্তিতে এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ উৎপত্তি নয়, ব্যবহারের নিরাপত্তা ও নিয়মই এখানে মূল বিষয়।

জোটের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রযুক্তির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার যুগে ব্যবহারকারীদের আস্থা অর্জন জরুরি। এজন্য জোটটি পাঁচটি মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করবে। এগুলো হলো নিরাপত্তা, গোপনীয়তা রক্ষা, স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্যতা ও স্থিতিস্থাপকতা।

মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট ও সুইডিশ টেলিকম প্রতিষ্ঠান এরিকসন এ জোটের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ দিয়েছে আরো ১৩টি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থা।

জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ভাবন যেন কোনোভাবেই ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাই হবে তাদের প্রধান কাজ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জোটটি একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড তৈরি করতে চায়, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও আস্থার নিশ্চয়তা দেবে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর এ সম্মিলিত উদ্যোগকে বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক দেশের সরকারই এখন নতুন নতুন আইন ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ভাবছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সেবার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বিদেশী সরবরাহকারীর ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করতে নিজস্ব প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশল নিচ্ছে।

জোট গঠনের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে মাইক্রোসফটের প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ বলেন, ‘বর্তমানে অনেক দেশের সরকার ও রাষ্ট্রের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। তারা নিজেদের প্রযুক্তিগত সীমানা আরো শক্তিশালী করতে চাইছে এবং নিজেদের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘বিশ্বজুড়ে আস্থার প্রকৃত সংজ্ঞা স্পষ্ট করতেই আমাদের এ প্রতিষ্ঠানগুলো একজোট হয়ে কাজ করছে। আমরা একটি উচ্চমানের মানদণ্ড তৈরি করতে চাই, যা প্রযুক্তির ওপর মানুষের বিশ্বাসকে আরো সুদৃঢ় করবে।’

জোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এরিকসনের প্রধান নির্বাহী বোরিয়ে একহম রয়টার্সকে বলেন, ‘সার্বভৌমত্ব শব্দটির মানে আসলে কী? আপনি যদি একে ভুলভাবে সংজ্ঞায়িত করেন, তবে এটি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সত্যি বলতে, এ গ্রহের এমন কোনো দেশ নেই যারা একা পুরোপুরি সার্বভৌম হতে পারে।’

তার মতে, বর্তমান বিশ্বের জটিল প্রযুক্তির যুগে প্রতিটি দেশকে একে অন্যের ওপর নির্ভর করতেই হয়।

১৫ সদস্যের এ শক্তিশালী জোটে মাইক্রোসফট ও এরিকসন ছাড়াও রয়েছে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস, অ্যালফাবেট (গুগল), ভারতের রিলায়েন্স জিও প্লাটফর্মস এবং ফিনল্যান্ডের নকিয়া। এছাড়া এআই খাতের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক ও কোহেয়ার, জাপানের এনটিটি ও জার্মানির এসএপির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ উদ্যোগে শামিল হয়েছে।

মাইক্রোসফটের ব্র্যাড স্মিথ জানান, জোটে যোগ দেয়া কোম্পানিগুলো নিজেরাই নীতিমালা মেনে চলার ঘোষণা দেবে। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের মাধ্যমে এটি যাচাইয়ের সুযোগও থাকবে। জোটের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত কানেক্টিভিটি, ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার, সেমিকন্ডাক্টর, সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজ করে।

স্মিথ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশ যেভাবে একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, আমাদের এ উদ্যোগ যদি তার বিপরীতে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে, তবেই আমরা সফল হব।’