আনুষ্ঠানিকভাবে বছরের প্রথম দিনে বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের সিইওর দায়িত্ব পেলেন গ্রেগ অ্যাবেল। এতদিন এ পদে ছিলেন বিনিয়োগ খাতের কিংবদন্তি ওয়ারেন বাফেট। বিশ্লেষকরা বলছেন, দায়িত্ব হাতবদলের এ প্রক্রিয়ায় নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে কনগ্লোমারেটটি। খবর এপি।
ওয়ারেন বাফেটকে বিশ্বের সর্বকালের সেরা বিনিয়োগকারী মনে করা হয়। ১৯৬২ সালে নিউ ইংল্যান্ডের ধুঁকতে থাকা একটি টেক্সটাইল কোম্পানির শেয়ার ৭ ডলার ৬০ সেন্টে কেনা শুরু করেন তিনি, সেখান থেকেই আজকের দৈত্যাকার বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ের যাত্রা। বর্তমানে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মূল্য ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি। গত ২০ বছরে ৬ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি দান করেছেন ওয়ারেন বাফেট। এর পরও তার হাতে থাকা বার্কশায়ারের শেয়ারের মূল্য প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলার।
কয়েক দশক ধরে বার্কশায়ার নিয়মিতভাবেই বার্ষিক গড় রিটার্নে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচককে ছাড়িয়ে গেছে। এ সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে জেইকো ও ন্যাশনাল ইনডেমনিটির মতো বীমা কোম্পানি, ইস্কার মেটালওয়ার্কিংয়ের মতো উৎপাদন খাতের প্রতিষ্ঠান, ডেইরি কুইনের মতো খুচরা ব্র্যান্ড, বড় ইউটিলিটি কোম্পানি, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে অপারেটর বিএনএসএফ অধিগ্রহণ। একই সঙ্গে বাফেট শত শত বিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনাবেচা করেছেন এবং আমেরিকান এক্সপ্রেস, কোকা-কোলা ও অ্যাপলের মতো কোম্পানিতে তার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে বিপুল মুনাফা হয়েছে।
অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই গতি ধরে রাখতে কিছুটা হিমশিম খাচ্ছে বার্কশায়ার। কোম্পানিটি এতটাই বড় হয়েছে যে নতুন ও বড় আকারের অধিগ্রহণ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি ৯৭০ কোটি ডলারে অক্সিকেম অধিগ্রহণও বার্কশায়ারের মোট মুনাফায় খুব বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে না।
গ্রেগ অ্যাবেল দায়িত্ব নেয়ার পর বার্কশায়ারের কৌশলগত পদক্ষেপে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা বিনিয়োগকারীরা নিবিড়ভাবে লক্ষ করবেন। তবে কোনো বড় ধরনের নাটকীয় পরিবর্তনের আশা করা ঠিক হবে না। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়ারেন বাফেট পুরোপুরি কোম্পানি ছাড়ছেন না। তিনি চেয়ারম্যান হিসেবেই থাকবেন এবং প্রতিদিন অফিসে এসে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজবেন ও অ্যাবেল চাইলে পরামর্শ দেবেন। উল্লেখ্য, ২০১৮ সাল থেকেই বার্কশায়ারের সব বীমা খাত-বহির্ভূত ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন অ্যাবেল।
সিএফআরএ রিসার্চের বিশ্লেষক ক্যাথি সাইফার্ট বলেন, ‘অ্যাবেলের পক্ষে ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন আনা স্বাভাবিক। তবে প্রায় চার লাখ কর্মী এবং ডজন খানেক সাবসিডিয়ারি নিয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানে তুলনামূলকভাবে প্রচলিত নেতৃত্ব কাঠামো গ্রহণ করাই যুক্তিসংগত।’
তবে অতি বিকেন্দ্রীকৃত কাঠামোয় পরিচালিত বার্কশায়ারে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়। কোম্পানিসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই।
২০২১ সালে বাফেটের মনোনীত উত্তরসূরি হিসেবে গ্রেগ অ্যাবেলের নাম ঘোষিত হয়। ওই সময় বাফেটের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার প্রয়াত চার্লি মাঙ্গার বার্ষিক সভায় শেয়ারহোল্ডারদের আশ্বস্ত করেন যে অ্যাবেল কোম্পানির সংস্কৃতি অটুট রাখবেন।
গত মাসের শুরুতেই কিছু ব্যবসার নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন অ্যাবেল। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক ও জেইকোর সিইও টড কম্বস কোম্পানি ছাড়েন এবং প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মার্ক হামবুর্গ অবসরের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে অ্যাবেল জানান, নেটজেটসের সিইও অ্যাডাম জনসনকে বার্কশায়ারের সব ভোক্তা, সেবা ও খুচরা ব্যবসার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। ফলে কার্যত কোম্পানির তৃতীয় একটি বিভাগ তৈরি হলো এবং অ্যাবেলের কাজের চাপ কিছুটা কমবে। তিনি নিজে উৎপাদন, ইউটিলিটি ও রেলওয়ে ব্যবসাগুলো তদারকি চালিয়ে যাবেন।
ভবিষ্যতে অ্যাবেলের ওপর লভ্যাংশ দেয়ার চাপও বাড়তে পারে। শুরু থেকেই বার্কশায়ারের অবস্থান হলো প্রান্তিক বা বার্ষিক লভ্যাংশ দেয়ার তুলনায় মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করাই ভালো। কিন্তু কোম্পানির কাছে থাকা নগদ ৩৮ হাজার ২০০ কোটি ডলার ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগাতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে লভ্যাংশ বা নিয়মিত শেয়ার পুনঃক্রয় কর্মসূচি চালুর দাবি জোরালো হতে পারে।
তবে আপাতত অ্যাবেল এ চাপ থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকবেন। কারণ বাফেটের হাতে কোম্পানির ভোটিং ক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ রয়েছে। তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে এ নিয়ন্ত্রণ কমবে। কারণ পূর্ব সমঝোতা অনুযায়ী তার সন্তানরা শেয়ারগুলো দাতব্য সংস্থায় বিতরণ করবেন।









