গত বছর কোরবানির ঈদের চামড়া সংগ্রহের পর ঠিকমতো বকেয়া পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকরা। শুধু তা-ই নয়, সরকার দাম নির্ধারণ করে দেয়ার পরও এবার ইচ্ছামতো দরে চামড়া কিনেছেন তারা। এ অবস্থায় নগদ অর্থের সংকটে এ বছর চামড়া সংগ্রহে অনীহা দেখাচ্ছেন চট্টগ্রামের চামড়া আড়তদাররা। এতে কোটি কোটি টাকার কাঁচা চামড়া অবিক্রীত থাকায় লোকসান গুনেছেন চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীরা।

মূলত কোরবানির ঈদে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে চামড়া সংগ্রহের সবচেয়ে বড় মৌসুম। এ মৌসুমে চামড়া ব্যবসার জন্য ঈদের আগেই পুঁজি মজুদ করেন মৌসুমি ও বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা। পর্যাপ্ত প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতের উপকরণ সংগ্রহ করে প্রস্তুতিও নেন তারা। কিন্তু কোরবানির ঈদের দিন থেকেই লবণের দাম এক লাফে বস্তাপ্রতি (৭৪ কেজি) ১৫০ টাকা বেড়ে যায়। এছাড়া ট্যানারি মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা আড়তদাররা সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে সমন্বয় করে চামড়া সংগ্রহে অনীহা দেখালে চামড়ার দাম দ্রুত কমতে থাকে। একদিনের ব্যবধানে চামড়ার দাম দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। এতে আড়তে চামড়া নিয়ে যাওয়ার খরচও উঠাতে পারেননি অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী। এসব খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে লবণজাত করার পরিবর্তে সড়কে কিংবা পাড়া-মহল্লায় ফেলে দেয় বা মাটিতে পুঁতে ফেলে।

চট্টগ্রামের আড়তদার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে একসময় ২২টি ট্যানারি ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এসব ট্যানারির সিংহভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে দুটি ট্যানারি থাকলেও ইটিপি না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞায় বন্ধ রয়েছে একটি (মদিনা ট্যানারি)। ফলে ঢাকার ট্যানারিগুলোই এখন চট্টগ্রামের আড়তদারদের প্রধান ভরসা।

চট্টগ্রামে কোরবানির ঈদে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ হয় (ছাগল, ভেড়া বাদে)। চট্টগ্রামের এসব চামড়া সংগ্রহের পর ঢাকার ট্যানারি মালিকদের ওপর নির্ভর করতে হয় ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের ৫০ কোটি টাকার বেশি ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া পড়ে আছে। এ কারণে আড়তদাররা নির্ধারিত দামের সঙ্গে সমন্বয় করে চামড়া সংগ্রহ করেননি মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। অধিকাংশ আড়তই চামড়া সংগ্রহ না করায় ব্যবসায়ীদের চাপে অন্যান্য আড়তদার কম দামে চামড়া সংগ্রহ শুরু করেন। এসব কারণে আড়তে চামড়া ব্যবসায়ীদের ভিড় বাড়তে থাকলে বিক্রয় চাপের কারণে চামড়ার দামও কমে যায়।

জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের বণিক বার্তাকে বলেন, আড়তগুলোর কাছে নগদ অর্থ নেই। ঢাকার অধিকাংশ ট্যানারি মালিকই চামড়া নেয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা ফেরত দেন না। ২০১৮ সালের নেয়া চামড়ার প্রায় ৩০ কোটি টাকা বকেয়া আটকে রয়েছে। এ কারণে আমরা চামড়া সংগ্রহ করতে পারিনি। ট্যানারি মালিকরা আশ্বস্ত করলে চামড়া শিল্পে নজিরবিহীন দরপতনের ঘটনা ঘটত না।

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী মো. সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রতি বছরের মতো এবারো কয়েকজন মিলে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চামড়া সংগ্রহ করেছেন তারা। কিন্তু কেনা চামড়াগুলোর জন্য আড়তদাররা ভালো দাম না দেয়ায় অধিকাংশ চামড়াই সড়কে ফেলে দিয়েছেন। এবারের চামড়া ব্যবসায় এতটা লোকসান হবে জানলে বিনিয়োগ করতেন না।

তবে ট্যানারি মালিকরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৫ সালের পর থেকে চামড়ার চাহিদাও নিম্নমুখী। বিশ্বব্যাপী সিনথেটিক লেদার বা চামড়ার বিকল্প কাঁচামালের ব্যবহার বাড়তে থাকায় বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। এজন্য পর্যাপ্ত সচেতনতা ছাড়াও চামড়া প্রক্রিয়াজাতসহ বিভিন্ন উপকরণের জোগান স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের একমাত্র চালু ট্যানারি রিফ লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকলেসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বিভিন্নভাবে চামড়া ব্যবসায়ী, মৌসুমি ব্যবসায়ীসহ সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহ না করার জন্য। সভা-সেমিনার করেও সবাইকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বেশি দামে চামড়া সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীরা লোকসান দিয়েছেন। চট্টগ্রামে যে পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ হয়, তার নামমাত্রই রিফ লেদার ক্রয় করে। ফলে চট্টগ্রামের চামড়ার বাজারের ওপর একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা নয় বলে দাবি করেছেন তিনি।