জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে বিশ্ব। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। যদিও বাস্তবে নিঃসরণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এ অবস্থায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী ৫০ বছরে ১৭৮ লাখ কোটি ডলার (ট্রিলিয়ন) হারাবে বিশ্ব অর্থনীতি। জিডিপির হিসাবে ২০৭০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমে যেতে পারে। নতুন একটি সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। খবর দ্য ন্যাশনাল নিউজ।
বহুজাতিক পেশাদার পরিষেবা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট জানিয়েছে, চলতি শতকের শেষদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি প্রাক-শিল্প পর্যায়ের ওপরে প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, তাহলে মানবজাতির বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র দেশগুলো।
ডেলয়েটের গ্লোবাল টার্নিং পয়েন্ট রিপোর্ট শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন উৎপাদন, কর্মসংস্থান হ্রাস, খাদ্য ও পানির ঘাটতি, স্বাস্থ্য ও সুস্থতার এবং বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার মানের অবনতি ঘটাবে। সমীক্ষাটিতে এশিয়া-প্যাসিফিক, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ ১৫টি অঞ্চল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তবে বিশ্ব নেতারা যদি প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রাক-শিল্প স্তরের ওপরে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ করতে পারেন, তবে পরবর্তী সময়ে জিডিপি বাড়বে। এমন সাফল্য আগামী ৫০ বছরে বৈশ্বিক জিডিপি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়িয়ে তুলবে। অর্থের হিসাবে যা ৪৩ লাখ কোটি ডলার।
ডেলয়েটের মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী মুতাসেম দাজানি বলেন, এ লাভ বা লোকসানের পরিসংখ্যান কিন্তু আমাদের পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। সবার জন্য আরো টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ব্যবসায়ীদের উচিত, নিজেদের অনুশীলনগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা। এমন ছোট পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বিপুল মুনাফা এনে দিতে পারে। এটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে যদি ব্যবসাগুলো স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার না দেয় এবং পরিবেশের প্রভাব নির্ণয় করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেগুলোর মূল্যবান প্রতিভা, রাজস্ব ও বাজারের হিস্যা হারিয়ে যেতে পারে।
যদিও ব্যবসায়ী নেতারা সমস্যার গুরুত্ব স্বীকার করছেন। ডেলয়েটের জরিপে নির্বাহী স্তরের ব্যবস্থাপকদের ৮৯ শতাংশ একমত হয়েছেন যে বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ে জরুরি অবস্থা তৈরি হয়েছে। যেখানে ৭৯ শতাংশ ব্যবস্থাপক মনে করেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া জানানোর এখনই মোক্ষম সময়। যা-ই হোক নিম্ন কার্বন ভবিষ্যতের জন্য অর্থনীতিকে রূপান্তর করতে শিল্প ও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমন্বয় ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারণ, পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে বৃহত্তর বিনিয়োগ এবং শিল্পজুড়ে সবুজ প্রযুক্তির মিশ্রণ তৈরিতে সরকারগুলোকে আর্থিক পরিষেবা ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, কয়লা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে প্রতিস্থাপন হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে ৭৮ লাখ কোটি ডলার যুক্ত হবে। পাশাপাশি নিট জিরো নিঃসরণে স্থানান্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। কারণ অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে হাইড্রোজেনের মতো জ্বালানি উেসর ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।
ডেলয়েট ইকোনমিকস ইনস্টিটিউটের অংশীদার ড. প্রদীপ ফিলিপ বলেন, আমাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে একটি নিম্ন কার্বন ভবিষ্যৎ কেবল সামাজিক দিক থেকে অপরিহার্য নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক বিষয়। এরই মধ্যে আমাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট মোকাবেলা এবং উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সুবিধা উন্মুক্ত করতে প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক মডেল ও নীতিপদ্ধতি রয়েছে। কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামাতে আমাদের এখন শুধু বিশ্বব্যাপী সরকার, ব্যবসা ও সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।










