যুক্তরাষ্ট্রে জুলাইয়ে তিন বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন অনুসারে, চার দশকের মধ্যে পণ্য মূল্য সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছার পর এ ধারা ক্রমেই ম্লান হচ্ছে। একই সঙ্গে সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার কমানোর প্রক্রিয়াটি গতিশীল হয়ে উঠবে। খবর এপি।

মার্কিন শ্রম বিভাগের তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে, আগের মাসের তুলনায় জুনে ভোক্তামূল্য সামান্য কমলেও জুলাইয়ে দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের তুলনায় গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২১ সালের মার্চের পর সর্বনিম্ন। অন্যদিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ। জুলাইয়ের এ ধারা বজায় রাখলে সামনে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো কম হতে পারে।

মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ২৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে সুদহার, যা দেশটির বড় থেকে ছোট ব্যবসা, পুঁজিবাজার, কর্মসংস্থান ও গৃহস্থালি জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেড সুদহার কমাতে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির শ্লথগতি নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। জো বাইডেন প্রশাসন এবং এর জ্বালানি নীতির মূল ব্যর্থতার কারণ হিসেবে এতদিন মূল্যস্ফীতিকে তুলে ধরে আসছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন সরকার বলছে, জুলাইয়ে ভোক্তামূল্য বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা গেছে তাতে ভূমিকা রেখেছে উচ্চ ভাড়া ও অন্যান্য আবাসন খরচ। সামনের দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতির হার আরো কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এ আবাসন ব্যয় হ্রাসের প্রভাব দেখা যাবে।

এ বিষয়ে জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ ও মার্কিন অর্থ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা তারা সিনক্লেয়ার বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ক্রমাগতভাবে ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি আসছে, এমনটাই দেখা যাচ্ছে প্রতিবেদনে। তবে মূল্যস্ফীতি অতি দ্রুত হারে কমবে না, কারণ এটি অর্থনীতির শ্লথতার লক্ষণ।’

মার্কিন শ্রম বিভাগের প্রতিবেদনটিকে ‘স্বস্তিদায়ক’ বলে উল্লেখ করেন এ অর্থনীতিবিদ। এতে নাটকীয় কোনো পরিবর্তন না থাকায় বোঝা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি সঠিক পথে রয়েছে।

জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রোসারি পণ্যের দাম জুনের তুলনায় দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক ধীর বৃদ্ধি। কিন্তু একই সময়ে অনেক মার্কিন নাগরিক খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারণ দাম এখনো তিন বছর আগের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। গ্যাসের দাম জুন-জুলাইয়ে অপরিবর্তিত থাকলেও এক বছর আগের তুলনায় ২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। পোশাকের দামও কমেছে গত মাসে যা ১২ মাসের আগের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত। জুলাইয়ে নতুন ও ব্যবহৃত গাড়ির দাম কমেছে। ব্যবহৃত গাড়ির দাম মহামারীর সময় আকাশচুম্বী উচ্চতায় পৌঁছলেও জুলাই পর্যন্ত এক বছরে প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। তবে মাছ, মাংস ও ডিমের মতো খাদ্যের দাম মহামারীর আগের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে দুগ্ধজাত খাবার, ফল ও সবজির দাম কমেছে জুলাইয়ে।

মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন অনুসারে দাম বৃদ্ধির হার ধীর হলেও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে অনেকেই সমস্যায় পড়ছেন। গড়ে তিন বছর আগের তুলনায় তাদের ২০ শতাংশ বেশি খরচ করতে হচ্ছে। তবে গত এক বছরের বেশি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গড় বেতন বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে।

খাদ্য সরবরাহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নিউইয়র্কের অ্যারিয়েল বরচুক জানান, তার মতো সাধারণ মানুষের কাছে মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন বিশেষ কোনো অর্থ বহন করে না। কারণ একটি চিকেন স্যান্ডউইচের জন্য ৭ ডলার ৯৯ সেন্ট খরচ তার কাছে বাহুল্য মনে হয়। তিনি এখন বাড়িতে তৈরি খাবার ও ডিসকাউন্টের শপের পণ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

প্রায় এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতিতে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। কারণ দুই বছর আগে মূল্যস্ফীতি চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছিল।

এদিকে ফেডারেল রিজার্ভের শিকাগো শাখার প্রেসিডেন্ট অস্টিন গুলসবি এক সাক্ষাৎকারে জানান, জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি প্রতিবেদন দেখাচ্ছে এর হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশের দিকেই রয়েছে।

তিনি আরো জানান, শ্রমবাজার দুর্বল হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য উচ্চ সুদহার রাখা হলে তা কর্মসংস্থানকে প্রভাবিত করে। তখন চাকরি খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে সামনের মাসগুলোয় সুদহারে একগুচ্ছ কাটছাঁটের সমর্থন করেন বলেও জানান অস্টিন গুলসবি।

এদিকে ফেড চেয়ার জেরোমে পাওয়েল বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার কমানোর শুরুর আগে মূল্যস্ফীতি কমার আরো প্রমাণ খুঁজছে। অর্থনীতিবিদরা আশা করেছেন সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে প্রথমবার সুদ কমাবে ফেড, এরপর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে কাটছাঁট দেখা যাবে। বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, এ কাটছাঁটগুলোর মধ্যে অন্তত একটি ৫০ শতাংশীয় পয়েন্ট হবে।