টালমাটাল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে ২০২০ সাল পার করছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার। করোনা মহামারীর কারণে বছরের শুরু থেকে চাহিদায় রেকর্ড পতন দেখা দেয়ায় জ্বালানি পণ্যটির ব্যাপক দরপতন ঘটে। চলতি বছরই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম শূন্য ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। করোনাকালে চাহিদায় পতন ও মূল্যযুদ্ধের ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে জ্বালানি পণ্যটির দাম। তবে এখনো তা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়েনি। এমনকি ২০২১ সালে গিয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানের তুলনায় খুব একটা বাড়বে না। এ ধারাবাহিকতায় আগামী বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ৫০ ডলারের নিচে অবস্থান করার সম্ভাবনা প্রবল।
ফিচ রেটিংস
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেডিট রেটিংস প্রতিষ্ঠান ফিচ রেটিংসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৪৫ ডলারে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ পরিচালক দিমিত্রি মারিনচেনকো বলেন, ওপেক ও এর মিত্র দেশগুলো জানুয়ারি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক উত্তোলন হ্রাসের পরিমাণ কমিয়ে আনছে। সে তুলনায় জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা নাও বাড়তে পারে। এ পরিস্থিতি জ্বালানি তেলের দামে দীর্ঘমেয়াদে মন্দা ভাব বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
তিনি আরো বলেন, ২০২১ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উত্তোলন বাড়বে। তবে জ্বালানি পণ্যটির চাহিদা বছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) আগে বাড়ার সম্ভাবনা কম। এ পরিস্থিতি বছরজুড়ে জ্বালানি তেলের কাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধিতে অন্তরায় হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার ভ্যাকসিন বাণিজ্যিক উৎপাদনে এলে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়াবে এমনটাই মনে করা হচ্ছিল। বাস্তবে সেটা সত্য হয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য ফাইজারের তৈরি ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আরো কয়েকটি দেশ একই পথে হাঁটছে। তৈরি হয়েছে আশাবাদ। এর জের ধরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বাড়তির পথে রয়েছে।
তবে এটাকে সাময়িক বলছেন দিমিত্রি মারিনচেনকো। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি নির্ভর করবে চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে সীমিত সরবরাহের ওপর। তাই কাঙ্ক্ষিত মূল্য বৃদ্ধি করতে হলে জ্বালানি তেলের চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য ফেরানো জরুরি।
রয়টার্সের জরিপ
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভ্যাকসিন নিয়ে আশাবাদ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘটালেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। বরং আগামী বছর ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে অবস্থান করতে পারে। রয়টার্সের এ জরিপে বিশ্বের প্রভাবশালী ৪০ অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষক অংশ নিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৪২ ডলার ৫০ সেন্টে। ২০২১ সালে জ্বালানি পণ্যটির গড় দাম কিছুটা বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৪৯ ডলার ৩৫ সেন্টে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর আগামী বছর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৪৬ ডলার ৪০ সেন্টে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, কভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও জ্বালানি তেলের বাজারে এর সুফল পেতে পেতে ২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধ এসে যাবে। এর আগে জ্বালানি পণ্যটির দামে বড় উল্লম্ফন দেখা দেয়ার সম্ভাবনা কম। তাই ২০২১ সালজুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে অবস্থান করতে পারে।
গোল্ডম্যান স্যাকস
জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা আশাবাদী পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৬৫ ডলারে উঠতে পারে। তবে বছরের শেষ ভাগে গিয়ে তা ফের ব্যারেলপ্রতি ৫০ ডলারের ঘরে নেমে আসার সম্ভাবনা প্রবল।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও চাহিদায় কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি—এ দুটি বিষয়ের ওপর জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য বাজার পরিস্থিতি নির্ভর করছে। ২০২১ সালের প্রথমার্ধে বোঝা যাবে, জ্বালানি পণ্যটির বাজারের গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়।
রয়টার্স, সিএনবিসি ও অয়েলপ্রাইসডটকম অবলম্বনে










