যুক্তরাজ্যে চলতি বছরের জুন-আগস্টের শিল্পোৎপাদন গত তিন বছরের সর্বনিম্নে পৌঁছেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা, রফতানি খাতে অবনতি ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রভাব ফেলেছে খাতটিতে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আগামী দিনগুলোয় আরো পতনের আশঙ্কা। সম্প্রতি এমনটাই উঠে এসেছে কনফেডারেশন অব ব্রিটিশ ইন্ডাস্ট্রির (সিবিআই) প্রকাশিত শিল্পোৎপাদন প্রতিবেদনে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
সিবিআই প্রকাশিত শিল্পোৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে কভিড লকডাউনের পর থেকে যুক্তরাজ্যে শিল্পোৎপাদন সবচেয়ে দুর্বল সময় অতিক্রম করছে। জুন-আগস্ট পর্যন্ত উৎপাদন ১৯ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। অথচ জুলাইয়ে ৩ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছিল। শ্রমিক সংগঠনের দাবি, কার্যক্রমে মন্থরতার কারণে সদস্যরা রীতিমতো বিস্মিত। কারণ চলতি বছরের জুন-আগস্টে বড় অংশ কোম্পানির প্রকাশিত বিবরণীর তুলনায় অন্তত দ্বিগুণ পতন ঘটেছে বলে তাদের দাবি। সে অনুসারে, ওই সময়ে ৩৭ শতাংশ পতন ঘটেছে শিল্পোৎপাদনে।
শিল্প খাতে বিস্তৃত প্রতিবন্ধকতার পরও সিবিআইয়ের মতে ১৫-১৭টি উপখাতে উৎপাদনের পতন ঘটেছে। মোটর গাড়ি, পরিবহন, কাগজ, প্রিন্টিং, মিডিয়া ও কেমিক্যালের উৎপাদন সূচকে উল্লেখযোগ্য অবনমন ঘটেছে। ২৭৭টি শিল্পোৎপাদন প্রতিষ্ঠান নিয়ে সম্প্রতি জরিপ পরিচালিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে দেশের অভ্যন্তরীণ ও রফতানি ক্রয়াদেশ স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল। মূল্য আগের চেয়ে কমতে শুরু করেছে যদিও। প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী দিনগুলোয় বিক্রয়মূল্য বাড়ার প্রত্যাশা করছে। ক্রমবর্ধমান সুদের হারে মন্দার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়ায় দেশটির উৎপাদন খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। ক্রমবর্ধমান ব্যয় মোকাবেলায় হিমশিম খাওয়া ব্রিটিশ কারখানাগুলো বর্তমানে অস্বস্তিতে রয়েছে। বিশ্বজুড়ে চাহিদা দুর্বল রয়ে গেলেও দামের চাপ কিছুটা কমেছে।
দ্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদহার বাড়িয়ে ৫ থেকে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। ১৪তম বারের মতো সুদহার বাড়ানোর এ সিদ্ধান্তের কারণে ঋণব্যয় বেড়ে গেছে। ব্যাংক উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার দিকেই বেশি মনোযোগী। সিবিআইয়ের অর্থনীতিবিদ মার্টিন সারটোরিয়াস দাবি করেছেন, কভিড-১৯ মহামারীর কারণে উৎপাদনের পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে দ্রুতগতিতে। ক্রয়াদেশের অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। এ জরিপের মধ্য দিয়ে শিল্পোৎপাদন খাতের নেতিবাচক পরিস্থিতিকেই তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘মূল্যসূচক নিম্নমুখী হওয়ায় হয়তো কারখানা ও সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে আসবে।’
সারটোরিয়াস বলেছেন, ‘শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমের দুর্বল পরিস্থিতি টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক বাজারে তুমুল প্রতিযোগিতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রগতিতে যুক্তরাজ্য সরকারের ভর্তুকির পদক্ষেপ।’ এদিকে শিল্পোৎপাদন কার্যক্রমের সংকোচনের কারণে চলতি প্রান্তিকে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) আগস্টে ৪৭ দশমিক ৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৫০ দশমিক ৮ পয়েন্ট। এ সূচক রয়টার্সের করা সব পূর্বাভাসের চেয়ে কম। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্রিস উইলিয়ামসন বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতির সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে আমাদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। ঝুঁকি তৈরি হয়েছে মন্দার।’
গত বছর ব্রিটিশ অর্থনীতি ১১ দশমিক ১ শতাংশ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে, যা ৪১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। শিল্পোৎপাদন খাত ব্রিটেনের মোট অর্থনীতির ১০ শতাংশ। উইলিয়ামসন বলেছেন, ‘কোম্পানিগুলোর পণ্য ও পরিষেবা কার্যক্রমের ওপর প্রভাব ফেলেছে জীবনযাত্রার ব্যয়, উচ্চ সুদহার, রফতানিতে পতন। গ্রাহকরা পণ্যের মজুদ কমিয়ে ফেলছেন আরো দ্রুতগতিতে। তার পরও উৎপাদনকারীরা এখনো আশাবাদী রয়েছেন ভোক্তাদের চাহিদা পুনরুদ্ধার হওয়ার জন্য। ’










