জলবায়ু পরিবর্তন এখন অন্যতম বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোয় অতিবৃষ্টি, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সমস্যায় প্রাণ-পরিবেশ বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরাসরি এর প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদন ও জীবন-জীবিকায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সারা বিশ্বেই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে। এ চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে জলবায়ু অর্থায়ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এসব খাত অর্থায়ন বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর এক যৌথ প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর মাল্টিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসের (এমডিবি) বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন ২০২৩ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৩৭ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ ঋণের বেশির ভাগই পেয়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো।

বহুপক্ষীয় ব্যাংকের পাশাপাশি একই সময়ে প্রাইভেট বা বেসরকারি খাতের অর্থায়নও তীব্রভাবে বেড়েছে, এর আকার ১৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। অর্থের এ অংক ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, এমডিবি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে গত বছর জলবায়ু অর্থায়ন ২৭ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমডিবির জলবায়ু অর্থায়ন শুধু পরিবেশ রক্ষা বা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা নয়, এটি দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার মূল হাতিয়ার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ শহর, পরিচ্ছন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নিরাপদ পানি ও খাদ্যে বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যাংকগুলো টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের দিকে এগোতে সাহায্য করছে দেশগুলোকে।

গত বছর জলবায়ু অর্থায়নে বেশির ভাগ হিস্যাধার ছিল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে এসব দেশে গেছে ৮ হাজার ৫১০ কোটি ডলার। গত পাঁচ বছরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে জলবায়ু অর্থায়ন দ্বিগুণ হয়েছে এবং এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৪ শতাংশ। এ অর্থের ৬৯ শতাংশ অর্থাৎ ৫ হাজার ৮৮০ কোটি ডলার ব্যবহার হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে। বাকি ৩১ শতাংশ বা ২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলার ব্যবহার হচ্ছে জলবায়ু অভিযোজনে। এছাড়া বেসরকারি খাত থেকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় অর্থায়ন হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

অন্যদিকে উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় এমডিবির জলবায়ু অর্থায়ন ৫ হাজার ১৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার ব্যবহার হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে, যা এসব দেশে মোট অর্থায়নের ৯০ শতাংশ। বাকি ১০ শতাংশ বা ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে জলবায়ু অভিযোজনে। এসব দেশেই বেসরকারি খাতের অর্থায়নের বেশির ভাগ ব্যবহার হচ্ছে ১০ হাজার ১০০ কোটি ডলার।

২০২৪ সালের জলবায়ু অর্থায়নে অবদান রেখেছে আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এএফডিবি), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি), ইউরোপিয়ান ব্যাংক ফর রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইবিআরডি), কাউন্সিল অব ইউরোপিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (সিইবি), ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি), নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপ।

এডিবি ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের মহাপরিচালক ইভজেনি জুকভ বলেন, ‘এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জলবায়ুগত অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর অন্যতম হলো ক্রমবর্ধমান পরিচ্ছন্ন জ্বালানির চাহিদা মেটানো, পাশাপাশি দারিদ্র্য ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগণকে চরম আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, গলন্ত হিমবাহ এবং পানি সংকটের বিরুদ্ধে সহনশীল করে তোলা।’

বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর জলবায়ু লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সর্বোত্তম কার্যকর ও প্রভাবশালী উপায়ে অর্থায়ন, যাতে জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন গতিশীল হয়।’

জলবায়ু অর্থায়ন আফ্রিকার মতো অর্থনৈতিক দুর্বল ও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেছেন আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড গ্রিন গ্রোথ বিভাগের পরিচালক অ্যান্থনি নাইয়ং।

পরিবেশবান্ধব খাতে অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও অর্থনীতিতে এর ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব খাতের বাস্তবায়নে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে অাফ্রিকা। জ্বালানি, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’

তিনি আরো জানান, মহাদেশটিতে জলবায়ু লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অভিযোজনের প্রচেষ্টা। মোট অর্থায়নের বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হচ্ছে আফ্রিকার দেশগুলোয় জীবিকা রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণে।

বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো বলছে, জলবায়ু অর্থায়নে আরো স্বচ্ছতা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তারা ডিজিটালাইজেশন উদ্যোগ নিচ্ছে। এতে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নের তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে আরো সহজে প্রবেশযোগ্য ও ব্যবহারবান্ধব হবে। এ ধরনের একটি পরিকল্পনা ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত চলতি বছরের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ উপস্থাপন করবে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলো।

গত বছর আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ২৯ সম্মেলনে কিছু প্রতিশ্রুতি দেয় এমডিবিভুক্ত ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় প্রতি বছর ১২ হাজার কোটি ডলার যৌথ জলবায়ু অর্থায়ন। এর ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার থাকবে জলবায়ু অভিযোজন বাবদ। এছাড়া বেসরকারি খাত থেকে প্রতি বছর আসবে অতিরিক্ত ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। একই সময়ে উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় প্রতি বছর ৫ হাজার কোটি ডলার জলবায়ু অর্থায়ন হবে। এর মধ্যে ৭০০ কোটি ডলার খরচ হবে অভিযোজন বাবদ। এছাড়া বেসরকারি খাত থেকে আসবে ৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।