বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করলেও এখনো তা রয়ে গেছে বিপজ্জনক মাত্রায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠোর মুদ্রানীতির কিছুটা সুফল মিললেও চাপ বাড়ছে বিনিয়োগসহ সার্বিক অর্থনীতিতে। পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণ সাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধবিগ্রহ ও বৈশ্বিক পণ্যবাজারে এর প্রভাবজনিত অস্থিরতা। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবারো যেকোনো সময় জোরালো হয়ে উঠতে পারে বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বিপাক। বিশেষ করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউরোপের দেশগুলো নিয়ে আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
যুদ্ধের অভিঘাতে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি আবারো যেকোনো সময় মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা মহাদেশটিতে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেই চলেছে বলে সংস্থাটির সাম্প্রতিক বক্তব্যে উঠে এসেছে।
চলতি সপ্তাহে ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের ইউরোপীয় বিভাগের পরিচালক আলফ্রেড কামের বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি বিস্ময়করভাবে বাড়তে পারে। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ এরই মধ্যে জ্বালানির মূল্যে প্রভাব ফেলেছে, যা ইউরোপে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে।’
আইএমএফের নতুন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রাথমিক প্রভাবে তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আমরা দেখছি যে প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য ১০ শতাংশ বেড়েছে। সংঘাত চলছে সীমিত পরিসরে। ফলে প্রভাবটাও বড় পরিসরে দেখা যায়নি। এটা নির্ভর করছে যুদ্ধের স্থায়িত্বকাল ও ব্যাপকতার ওপর।’
সম্প্রতি প্রকাশিত এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চাহিদার অবনতি হওয়ায় ইউরোজোনের অর্থনীতি অক্টোবরে প্রায় তিন বছরের মধ্যে দ্রুত গতিতে সংকুচিত হয়েছে। পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স গত মাসে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অক্টোবর পঞ্চম মাস, যেখানে সূচকটি ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির একটা নেতিবাচক দিক হচ্ছে কর্মসংস্থানের স্থবিরতা। ৩২ মাস ধরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
অক্টোবরে তীব্র মন্দা ছিল। পরিষেবা প্রদানকারীদের সেবার মান আরো খারাপ হয়েছে। সেপ্টেম্বরের চেয়ে কারখানার উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ সমীক্ষার তথ্য ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় মাসের জন্য সতর্ক সংকেত বহাল রেখেছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের ওই সমীক্ষায় আরো উঠে আসে, গোটা ইউরোপে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম স্পেন। সেখানে অক্টোবরে বেসরকারি খাত আগের মাসের সমান ছিল। জার্মানি ও ফ্রান্স উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। আয়ারল্যান্ডে ১১ মাসের মধ্যে প্রথম উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।
মহামারী-আক্রান্ত হওয়ার সময় বাদ দিলে নতুন ব্যবসায় সাম্প্রতিক পতন ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে সবচেয়ে বেশি ছিল। সে সময় ইউরোপ ঋণ সংকটে পড়েছিল।
আইএমএফের প্রতিবেদন অনুসারে, ইউরোপের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আয় এবং মজুরি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবে প্রবীণ জনসংখ্যার চাপ সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতাকে সংকুচিত করে রাখছে। একে নীতিনির্ধারকরা নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। চুক্তিভিত্তিক মজুরি স্থায়ী শ্রমবাজারের ওপর চাপ তৈরি করছে, যা মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে তুলেছে।
দুই বছর পর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। শ্রমিকদের বেশি মজুরি দেয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ইউরোপের কয়েকটি অঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। অন্য অঞ্চলে ১০ শতাংশ হয়েছে। উচ্চ মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু আইএমএফ সতর্ক করেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল মজুরি বাড়ালে হিতে বিপরীত হতে পারে।
আইএমএফ ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছে যে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিগুলো পর্যবেক্ষণ করা দরকার। উৎপাদন ও মজুরির মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে হবে। চাকরি, ভবিষ্যতের কর্ম, দক্ষ শ্রমিক, অভিবাসী শ্রমিক এসব কিছুর সঙ্গে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির সমন্বয় জরুরি।










