বিনিয়োগের অন্যান্য খাতের তুলনায় গত বছর দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা খাতে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে বৈশ্বিক হেজ ফান্ড। বিশেষ করে হারিকেন ও সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ খাতে সর্বোচ্চ মুনাফা মিলেছে। লন্ডনভিত্তিক হেজ ফান্ডের পোর্টফোলিওতে ১২০টি সিকিউরিটিজ গত বছর ১৮ শতাংশ মুনাফা করেছে। টেন্যাক্স ক্যাপিটাল, ট্যানজেন্সি ক্যাপিটাল ও ফারম্যাট ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। এ তিন কোম্পানির মুনাফা হয়েছে অন্যদের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। সরকারি নথি, বিশেষজ্ঞদের হিসাব ও কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে এসব তথ্য নেয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, ঝুঁকি বন্ড ও এ ধরনের সিকিউরিটিজগুলোর দৃঢ় অবস্থানের কারণে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফার দেখা পেয়েছে কোম্পানিগুলো। সাধারণত বীমা কোম্পানিগুলোকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে বর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয় ক্যাট (দুর্যোগ) বন্ড। যদি আংশিক বা পুরোপুরিভাবে দুর্যোগ আঘাত হানে ও কোম্পানিগুলো পুঁজি হারায়, তখন এ ঝুঁকি মোকাবেলার দায়িত্ব নেন বিনিয়োগকারীরা। যদি নতুন করে অজানা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে, তাহলে এর বিনিময়ে বিনিয়োগকারী বিপুল মুনাফা করতে পারেন। এর সবই গত বছর একসঙ্গে ঘটেছিল, অজানা কোনো দুর্ঘটনাও ঘটেনি। ফলে খুব বেশি মুনাফা করেছে হেজ ফান্ড।
লন্ডনভিত্তিক বিকল্প বিনিয়োগ পরামর্শক সংস্থা প্রেকিন জানিয়েছে, ২০২৩ সালের হেজ ফান্ড বিনিয়োগের কৌশলগুলোর মধ্যে ছিল বীমাযুক্ত সিকিউরিটিজ। এর মধ্যে ক্যাট বন্ড সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। এ খাতে ১৪ শতাংশের বেশি মুনাফা হয়েছে। প্রেকিনের সাময়িক মুনাফা ছিল ৮ শতাংশ। এর বিপরীতে সুইস রে কোম্পানির বৈশ্বিক ক্যাট বন্ড খাতে সার্বিক মুনাফা হয়েছে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পুনর্নির্মাণ খাতে ব্যয় তুলনামূলক বেড়েছে। এর কারণ কয়েক দশকের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। কিন্তু ২০২৩ সালে ক্যাট বন্ডে উচ্চ মুনাফার পেছনে কোম্পানিগুলোর গত কয়েক বছরের পরিকল্পনা কাজ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৭ সালে হারিকেনের আঘাতে প্রচুর বাড়ি-ঘর ভেঙে যায়। তখন এসব প্রপার্টি পুনর্নির্মাণে বিনিয়োগকারীরা নগদ টাকা নিয়ে এগিয়ে আসেন। একই ঘটনা ঘটে ২০১৯ ও ২০২০ সালে। এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্লোরিডায় আঘাত হানে হারিকেন আয়ান। অঙ্গরাজ্যটির ইতিহাসে আয়ান ছিল সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়। বীমা কোম্পানি মিউনিখ রের মতে, ওই সময় ১০ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বীমা করা ছিল। এছাড়া মূল্যস্ফীতির কারণে পুনর্নির্মাণ খরচও বেশি হয়েছিল। এ ঘটনা ক্যাট বন্ডকে মার্কেটে ফিরিয়ে আনতে শক্তি জুগিয়েছে।
ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানি সুইস রের গ্লোবাল হেড জ্যঁ-লুই মনিয়ের বলেছেন, ‘আবাসন খাতের বীমা মূল্য ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশ হয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোর আরো বিনিয়োগ করা উচিত।’
বীমাসংশ্লিষ্ট আর্থিক খাত বিশ্লেষক আর্টেমিসের হিসাব অনুসারে, ২০২৩ সালে ক্যাট বন্ড ইস্যু সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে, সম্পত্তিবহির্ভূত ও ব্যক্তিগত লেনদেনসহ যার পরিমাণ ১৬৪০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
রিইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নেফিলার সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ হ্যাগুড বলেছেন, ‘গত বছর আমার কর্মজীবনে সম্ভবত সর্বোচ্চ মুনাফা দেখেছি।’
সুইস রে ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বৈশ্বিক ক্যাট বন্ড সক্ষমতা গত ছয় বছর ৪ শতাংশ করে বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা করছে।
টেন্যাক্স ক্যাপিটালের অ্যানালিস্ট টবি পুঘে বলেছেন, নব্বইয়ের দশকে ক্যাট বন্ড তৈরির পর থেকে এত ভালো মার্কেট এর আগে আমরা দেখিনি।’










