ইউক্রেনে আগ্রাসী নীতির প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘ দোলাচলের পর রুশ জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে একমত হয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। তবে ব্লকটির প্রত্যাশা অনুযায়ী বিশ্ববাজারে এ নিষেধাজ্ঞার বড় প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। খবর আনাদোলু এজেন্সি।
গত সপ্তাহে ইইউর নেতারা ষষ্ঠ ধাপে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে একমত হন। এতে চলতি বছরের শেষ নাগাদ রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়।
গত মাসের শুরু থেকেই আলোচনার টেবিলে ছিল এ পরিকল্পনা। ছয় মাসের মধ্যে রাশিয়ান অপরিশোধিত জ্বালানি এবং বছরের শেষ নাগাদ পরিশোধিত পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে লম্বা সময় ধরে আলাপ আলোচনা চলে।
তবে এ পরিকল্পনায় প্রথম বাধা হয়ে দাঁড়ায় হাঙ্গেরি। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ করে দিলে অর্থনীতি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আর এ বিপর্যয় সামাল দেয়ার সক্ষমতা নেই দেশটির সরকারের। পরিস্থিতি বিবেচনায় হাঙ্গেরিকে নিষেধাজ্ঞার আওতা থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া ও বুলগেরিয়াকেও বাদ দেয়া হয়। এসব দেশ ড্রুজবা পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারবে।
ইইউ রাশিয়া থেকে প্রতি বছর ২৫ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে অঞ্চলটি বর্তমানে অন্যান্য জ্বালানি তেল উত্তোলন দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। এর মধ্যে তালিকায় শুরুর দিকে আছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ইরান। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এ নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ আন্তর্জাতিক বাজারে খুব কমই প্রভাব ফেলবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জন রবার্টস বলেন, জ্বালানি তেলের বাজারে কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। কারণ জ্বালানি তেলের বাজার খুব সহজে পরিবর্তনশীল। এর অর্থ হলো এটির জাহাজীকরণ বা পরিবহন আটকে রাখার সুযোগ নেই। একটি উৎসেঘাটতি দেখা দিলে অন্য উৎস থেকে সরবরাহ আসবে স্বাভাবিকভাবেই।
রবার্টস বলেন, জ্বালানি তেলের জাহাজীকরণ খুব সহজে পরিবর্তনশীল। নানাভাবেই এটি করা যায়। কিন্তু গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ঠিক এর উল্টো। আপনি যদি রাশিয়ান জ্বালানি তেল না কেনার সিদ্ধান্ত নেন, তবে আপনি অন্য দেশ থেকে চাহিদা মেটাতে পারেন। এটি উন্মুক্ত বাজার। যদি তারা (ইইউ) রাশিয়ান জ্বালানি তেল কিনতে না চায়, তবে সৌদি আরব, নাইজেরিয়া কিংবা উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে কিনতে পারে। এটি বিশ্ববাজারে। এখানে যেখান থেকে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই জ্বালানি তেল কেনা সম্ভব।
অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কাটাতে ইউরোপের পরিবর্তে অন্য আমদানিকারক দেশগুলোয় জ্বালানি তেল বিক্রি বাড়াবে রাশিয়া। এক্ষেত্রে এগিয়ে চীন। এমনটাই জানিয়েছেন রবার্টস।
চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস জানায়, দেশটি গত মাসে ৪ কোটি ৩০ লাখ ৩০ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে। এটি মার্চের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, জানুয়ারির চেয়েও আমদানি বেড়েছে।
রবার্টস বলেন, ইইউর রাশিয়ান জ্বালানি তেল খাতে নিষেধাজ্ঞা বড় কোনো সমস্যা নয়। তার মতে, হাঙ্গেরিকে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তে না রাখা বড় সমস্যা। দেশটি রাশিয়ান জ্বালানি তেলের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে তেল আসা বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতিতে ধস নামবে। হাঙ্গেরির মতো আরো কয়েকটি দেশের জন্য আমদানির পথ খোলা রাখা হয়েছে।
ইইউর নিষেধাজ্ঞার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব সম্পর্কে রবার্টস বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উত্থান-পতনে এ নিষেধাজ্ঞা খুবই সামান্য ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে মুনাফার হার বৃদ্ধি, লকডাউনসহ নানা বিষয় বাজারে প্রধান নির্দেশকের ভূমিকা পালন করছে। জ্বালানি তেলের দাম কমছে। এ পরিস্থিতিতে উত্তোলন সীমিত করবে কিনা সে বিষয়ে নন ওপেক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা করছে ওপেকভুক্ত দেশগুলো।
বর্তমানে মূল্য নির্ধারণ ইস্যুকে যতটা না প্রধান্য দেয়া হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দেয়া হচ্ছে রাশিয়ার বাজার পরিবর্তনকে। কারণ দেশটি ইউরোপের মতো নিজেদের বৃহৎ জ্বালানি বাজার থেকে সরে আসছে।
রাশিয়া যতদিন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করবে না, ততদিন ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়াকে নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে গ্রহণ করবে না। ধীরে ধীরে অঞ্চলটি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরো গুটিয়ে নেবে বলে মনে করছে রবার্টস।










