ভারতের প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদন এলাকাগুলোয় বন্যার কারণে এবার আবাদ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে। সরবরাহ সংকট দেখা দেয়ায় বাংলাদেশে মসলা পণ্যটির দাম হঠাৎ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে আমদানি না করলে আগের বছরের ন্যায় এবারো পেঁয়াজের বাজারে ফের অস্থিরতা দেখা দেবে বলে শঙ্কা ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের।
দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গতকাল ভারতীয় নাসিক জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকা কেজি দরে। যদিও কয়েক দিন আগে একই মানের পেঁয়াজের কেজিপ্রতি পাইকারি মূল্য ছিল ৪০ টাকা। অন্যদিকে ভারতীয় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মিয়ানমার থেকে আমদানি হওয়া পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকায়। আমদানীকৃত পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশীয় পেঁয়াজের ওপরও। দেশীয় পেঁয়াজের দাম প্রায় সমপরিমাণ বেড়ে ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কয়েক বছর ধরে রবি মৌসুমের আগেই ভারত থেকে পেঁয়াজের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে আসছে, যার প্রভাবে অস্থির হয়ে ওঠে দেশে মসলা পণ্যটির বাজার। সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির মাধ্যমে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল করা হয়। পরিস্থিতি এবারো সেদিকেই যাচ্ছে বলে শঙ্কা ব্যবসায়ীদের। তাদের ভাষ্যমতে, সাউথ ইন্ডিয়ার বেঙ্গালুরুতে প্রবল বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে, যার কারণে ভারতের সবচেয়ে বেশি উৎপাদনকারী নাসিক জেলার পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে।
খাতুনগঞ্জের মেসার্স ইরা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফারুক এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে ভারতের বন্যার প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। ভারত সরকার পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়াতে বাড়াতে এক পর্যায়ে রফতানিও বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে সাউথে প্রবল বন্যায় ফসলহানির কারণে পেঁয়াজের ক্রয়মূল্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। কয়েক দিন আগেও বর্ডার এলাকায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৪ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে সেটি ৫২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে দেশীয় পেঁয়াজের মজুদও কমে আসায় দেশের বাজারে অতীতের মতো পেঁয়াজের দাম নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক গড় উৎপাদন ২৫ লাখ টন। তবে পচন ও মজুদ সংকটে এর সিংহভাগ পেঁয়াজই সময়মতো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়, যার কারণে প্রতি বছর রবি মৌসুমের আগে দেশের বাজারে পেঁয়াজের সংকট তৈরির পাশাপাশি অতিমাত্রায় ভারতনির্ভরতা কাজ করে। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১১ লাখ টন পেঁয়াজ ভারত ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করেন দেশীয় ব্যবসায়ীরা। কয়েক বছর ধরে সংকটকালীন মিয়ানমারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা পূরণ করা হয়। ভারতে মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে এখন থেকে বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরুর পরামর্শ তাদের। তা না হলে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম বিগত বছরের ন্যায় বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি ভারতীয় নাসিক পেঁয়াজের ভারতীয় ক্রয়মূল্য পড়ছে ৩৫ রুপি, বাংলাদেশ বর্ডার পর্যন্ত পরিবহন খরচ ৭ রুপি, সীমান্ত স্থলবন্দরে কেজিপ্রতি ট্যাক্স ২ রুপিসহ মোট খরচ হয় ৪৪ রুপি। ভারতীয় রুপির বিনিময় মূল্য ১ দশমিক ২৫ টাকার হিসাবে বর্ডার পর্যন্ত ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি খরচ হয় ৫৫ টাকা।
এ হিসাবে দেশের বিভিন্ন আড়তে পণ্য পৌঁছাতে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা খরচ যুক্ত করলে কেজিপ্রতি ভারতীয় পেঁয়াজের কস্টিং ৫৮ টাকা পড়ে। ফলে আগের আমদানি হওয়া পেঁয়াজের মজুদ শেষ হয়ে এলে আগামীতে দাম আরো বাড়তে পারে।
দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন মৌসুম শুরু হবে আসন্ন রবি মৌসুমে। অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া রবি মৌসুমে পেঁয়াজের আবাদ হলে জানুয়ারি থেকে মার্চে পেঁয়াজ উত্তোলন শুরু হবে। এর আগে দেশীয় মজুদ ও আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে। ফলে ভারতে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধিতে মিয়ানমারসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাবে। সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে আমদানি ছাড়া উপায় নেই বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।









