পৃথিবীর ব্রেড বাস্কেট খ্যাত দেশগুলো বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে লম্বা সময় ধরেই লড়ছে। কখনো খরা আবারো কখনো অতিবৃষ্টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদনে। তার ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানি ব্যয় কৃষি খাতকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে আগামী বছর খাদ্যশস্য ও তেলবীজ উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। সরবরাহ সংকটে এ সময় দামও থাকবে ঊর্ধ্বমুখী। সিডনিভিত্তিক কৃষিপণ্যের ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ইকন কমোডিটিজের বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

চলতি বছর গম ও চালের মতো প্রধান খাদ্যশস্যগুলোর মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। অন্তত আগামী বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মজুদ পরিপূর্ণ হবে না। লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বৈরী আবহাওয়ায় ভোজ্যতেল উৎপাদন নিয়েও শঙ্কা কাটছে না।

ইকন কমোডিটিজের ডিরেক্টর অব অ্যাডভাইজরি সার্ভিস ওলে হো বলেন, বর্তমান চাহিদায় সাড়া দিতে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ শস্য উৎপাদন প্রয়োজন। ২০২৩ সালে উৎপাদন ও সরবরাহসহ সব দিক থেকেই ভালো পারফরম্যান্স করতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে খাদ্যশস্য ও তেলবীজের জন্য রেকর্ড উৎপাদন নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।

গম, ভুট্টা ও পাম অয়েলের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য কয়েক বছরে রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমেছে। তবে খুচরা পর্যায়ে দাম এখনো ঊর্ধ্বমুখীই। আগামী বছর সরবরাহ সংকুচিত থাকবে বলে পূর্বাভাস দিচ্ছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ওই বছরও দাম অব্যাহত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছলে ভোগান্তিতে পড়ে লাখো মানুষ। বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে। এরই মধ্যে দেশগুলো ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতা সমস্যায় পড়েছে।

বৈশ্বিক খাদ্য আমদানি ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এতে দরিদ্র দেশগুলোর জনগণ দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে অনেক খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে।

এ বছরের মার্চে শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহ মূল্য ইতিহাসের সর্বোচ্চে পৌঁছে। প্রতি বুশেলের মূল্য স্থির হয় ১৩ ডলার ৬৪ সেন্টে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈরী আবহাওয়া ও করোনা মহামারীর প্রভাব বাজারদর এতটা ঊর্ধ্বমুখী করে তোলে। অন্যদিকে ভুট্টা ও সয়াবিনের দাম এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চে উঠে আসে। মার্চে রেকর্ড সর্বোচ্চে ওঠে মালয়েশিয়ান পাম অয়েলের বাজারদরও।

তবে জুলাইয়ের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা এবং চীনে নতুন করে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে কমতে থাকে গমের দাম। শস্যটির বাজারদর যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরেছে। পাম অয়েলের দাম কমেছে ৪০ শতাংশ। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে খাদ্যশস্য রফতানিসংক্রান্ত চুক্তিও দাম কমতে সহায়তা করেছে।

তবে আগামী বছর বাজার আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে বৈরী আবহাওয়া। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বন্যায় অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে শস্য উৎপাদন। অথচ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এসব শস্য সংগ্রহের কথা ছিল। তীব্র খরায় আর্জেন্টিনায় গম উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আগামী বছরের প্রথমার্ধে বিশ্ববাজারে গমের প্রাপ্যতা কমবে। যুক্তরাষ্ট্রে অতিবৃষ্টিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বের শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ ভারত শস্যটির রফতানি শুল্ক ব্যাপক বাড়ানোয় দাম কমার সম্ভাবনা নেই। ভারত ছাড়া অন্যান্য রফতানিকারক দেশে চালের প্রাপ্যতাও কমতির দিকে।