উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আরো কিছুদিন লড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির অনেক দেশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হারে মূল্যস্ফীতি স্থির থাকায় এসব অর্থনীতিতে বিদ্যমান উচ্চ সুদহার আরো দীর্ঘায়িত করতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা চলমান থাকতে পারে। সম্প্রতি এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। খবর বিবিসি ও ইউরো নিউজ।

সংস্থাটি বলছে, বিশ্বজুড়ে জাতীয় নির্বাচন নতুন সরকারগুলোর নীতিতে ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’ আনতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘অনিশ্চয়তা’ বাড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য এমন আশঙ্কা সত্ত্বেও এপ্রিলের পূর্বাভাসের সঙ্গে সংগতি রেখে চলতি বছর বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশ বহাল রেখেছে আইএমএফ। এছাড়া ২০২৫ সালে এর থেকে সামান্য অগ্রগতি অর্থাৎ ৩ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আইএমএফ জানায়, বছরের শুরুতে কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। এ কারণে প্রবৃদ্ধির হারে প্রাথমিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা কমেছে। অর্থাৎ দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হারের ব্যবধান ছোট হয়ে আসছে। একই সঙ্গে মূল্য সংকোচন নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে আইএমএফ।

আইএমএফ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে অবদান রাখে এমন ঝুঁকিগুলো বেড়েছে। এটি ইঙ্গিত করে মূল্যস্ফীতির হারকে নিচের দিকে না বাড়িয়ে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়ার আরো অনেক কারণ রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি হতে পারে এমন ঝুঁকির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে বর্ধিত সময়ের জন্য উচ্চ সুদহার বজায় রাখতে হতে পারে। এছাড়া ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েও ওয়াকিবহাল আইএমএফ। এ কারণে বাণিজ্য উত্তেজনার বৃদ্ধিতে সরবরাহ চেইনে আমদানীকৃত পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক পেটিয়া কোয়েভা ব্রুকস জানান, বৈশ্বিক বাণিজ্য এখন ক্রমবর্ধমান হারে ব্লকভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে। এতে ঘনিষ্ঠ জোটের দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়ছে, অন্যদিকে বিপরীত জোটের সঙ্গে বাণিজ্য কমছে। বিপরীত দুটি প্রবণতার কারণে সামগ্রিক বাণিজ্যে আংশিক ভারসাম্য দেখা যাচ্ছে।

বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষ করে এশিয়া থেকে শক্তিশালী রফতানি দেখা গেলেও প্রযুক্তি খাতের বিধিনিষেধ নতুন ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

সম্প্রতি চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপিত শুল্ক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে কোয়েভা ব্রুকস বলেন, ‘এ ধরনের ক্রিয়াকলাপ সাধারণত শুল্প আরোপ হওয়ার দেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা পাশাপাশি অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়। এর কিছু ভালো দিক থাকতে পারে। তবে আমরা দেশগুলোকে একতরফাভাবে না করে বহুপক্ষীয়ভাবে সমাধান করার আহ্বান জানাই।’

আইএমএফ জানায়, ইউরোপ ও অন্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেবে পরিষেবা কার্যক্রম, যা আংশিকভাবে মহামারীর পরে চাহিদার স্বাভাবিক পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে। কভিড-১৯ লকডাউনের সময় পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যায় এবং পরিষেবার কার্যকলাপ স্থবির হয়ে পড়ে। পরে সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিষেবার চাহিদা আবার বেড়ে যায়।

২০২৪ সালে ইউরোজোনের প্রবৃদ্ধি দশমিক ৯ শতাংশের পূর্বাভাস দেয়া হলেও ২০২৫ সালের জন্য সামান্য বাড়িয়ে তা ১ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে আইএমএফ।

এদিকে এপ্রিলে দেয়া পূর্বাভাস ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৬ শতাংশে সংশোধন করে নামিয়ে এনেছে আইএমএফ। কারণ হিসেবে প্রত্যাশার চেয়ে অর্থনীতির শ্লথগতিকে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি দেনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের পুনরুত্থান ও শক্তিশালী রফতানির কারণে ২০২৪ সালে চীনের জন্য ৫ শতাংশ সংশোধিত পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। তবে আগামী বছর প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতি চলতি বছরে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ সম্প্রসারণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীন ও ভারতে শক্তিশালী পারফরম্যান্স এতে ভূমিকা রাখছে। ভারতের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস চলতি বছরের জন্য এপ্রিলে দেয়া ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে সংশোধন করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের জন্য চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি দশমিক ৭ শতাংশ আশা করা হচ্ছে, যা ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৫ শতাংশে সম্প্রসারণ হবে। এছাড়া ২০২৪ সালের জন্য জাপানের সংশোধিত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এপ্রিলের দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৭ শতাংশ করা হয়েছে। মূলত সরবরাহ চেইন বিঘ্ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ কমায় প্রভাবিত হচ্ছে দেশটির অর্থনীতি।