গাজায় ইসরায়েলি হামলার শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছিল। সম্প্রতি তেহরানে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া ও বৈরুতে হিজবুল্লাহ নেতা ফুয়াদ শোকরের হত্যা এ সংঘাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন যুদ্ধ লেবানন ও ইসরায়েল উভয় পক্ষের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তেহরানের নিষেধাজ্ঞা-বিধ্বস্ত অর্থনীতি আরো শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি পুরো অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে। খবর দ্য ন্যাশনাল।

বছরের পর বছর রাজনৈতিক অচলাবস্থার শিকার হয়ে আসছে লেবাননের অর্থনীতি। সম্ভাব্য যুদ্ধে দেশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য বাইব্লস ব্যাংক গ্রুপের বৈরুত সদর দপ্তরের গবেষণা বিভাগের প্রধান নাসিব ঘোব্রিলের। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের দেয়া হুমকি অনুসারে, চলতি বছরে লেবাননের অর্থনীতি ১০-১৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।’ 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তেহরানে গিয়েছিলেন ইসমাইল হানিয়া, সেখানে তিনি দেহরক্ষীসহ নিহত হন। অন্যদিকে বৈরুতে ফুয়াদ শোকরকে সমাহিত করার পর হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ বলেন, ‘‌এ হত্যাকাণ্ড যুদ্ধে নতুন একটি পর্ব শুরু করবে। তবে ফুয়াদ শোকরকে হত্যার দায় স্বীকার করলেও ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার দায় নেয়নি ইসরায়েল।’ 

বিশ্লেষক সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স বলছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ লেবাননে একটি স্থায়ী ইসরায়েলি অভিযান ডেকে আনতে পারে, যা একটি আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে। সংস্থার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের ঝুঁকিবিষয়ক প্রধান জ্যাক কেনেডি বলেন, ‘ইরান, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনি অঞ্চল থেকে ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ দেখা যেতে পারে।’ 

লেবানন কয়েক দশক ধরে প্রক্সি যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত দেখে আসছে। দেশটির অর্থনীতি বর্তমানে ‘সম্পূর্ণ পতনের’ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জায়ে ক্যাপিটাল মার্কেটসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাঈম আসলাম। তার মতে, সম্ভাব্য সামরিক সংঘর্ষে ক্ষতির মাত্রা ফিলিস্তিনের সঙ্গে তুলনীয় হবে না। নাঈম আসলাম বলেন, ‘ফিলিস্তিনে যা ঘটেছে তার মতো প্রভাব ফেলবে না। বর্তমানে কেউ এমনটা ভাবছেন বলেও আমি মনে করিনি। এটি খুব সীমিত আকারে হতে পারে।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে লেবাননে ইসরায়েলের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে হিজবুল্লাহর সামরিক সম্পদ বা তার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর মধ্যে রয়েছে বৈরুত-রফিক হারিরি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বৈরুত সমুদ্রবন্দর। সেইসঙ্গে সিডন, টায়ার ও দক্ষিণ লেবাননের সব বন্দর অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

যুদ্ধের কারণে লেবাননের অর্থনীতি এরই মধ্যে ১৫০ কোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। দেশটির ব্যাংক খাত ৭ হাজার কোটি ডলারের বেশি লোকসান করেছে। ২০১৯ সালে প্রথমবার ঋণখেলাপি হিসেবে নাম লেখায় লেবানন। এরপর থেকে দেশটির মুদ্রার মান কমেছে ৯০ শতাংশেরও বেশি। 

রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির আকস্মিক মৃত্যুর পর সম্প্রতি ইরানের ক্ষমতায় বসেছেন অপেক্ষাকৃত সংস্কারবাদী মাসুদ পেজেশকিয়ান। কিন্তু তেহরানে ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা তার অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতে ধাক্কা দিয়েছে। নতুন যুদ্ধ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার প্রচেষ্টার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর মতো খাতে বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করবে।

এমনিতেই পশ্চিমাদের নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জালে আবদ্ধ ইরান। এখন নতুন যুদ্ধ সেই ঝুঁকি আরো বাড়াবে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিআইও অফিসের প্রধান নির্বাহী গ্যারি ডুগানের মতে, ইরানে নতুন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু চলমান সংকট শিথিলের পরিবর্তে আরো কঠোরতার দিকে যেতে পারে।

এদিকে গাজায় যুদ্ধের কারণে বড় অংকের ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে ইসরায়েল। এখন বহুমুখী সংঘাত কোষাগারের ওপর আরো চাপ বাড়াবে। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ এলিয়ট গারসাইড বলেন, ‘এরই মধ্যে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে দেশীয় ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এখন নতুন যুদ্ধ আরো ঋণ নেয়ার কারণ হবে। এর একটি সম্ভাব্য পরিণতি হলো ইসরায়েলের ক্রেডিট রেটিংয়ে আবারো অবনমন, যা ভবিষ্যৎ অর্থায়নকে আরো কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলবে।’

লেবানন ও ইরানজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাবে। এতে পর্যটন, শিপিং, খুচরা ও রিয়েল এস্টেট খাত প্রভাবিত হবে। লেবানন, জর্ডান ও মিসরের কারেন্ট অ্যাকাউন্টে ১২ থেকে ২৬ শতাংশ ভূমিকা রাখে পর্যটন। এসঅ্যান্ডপির পূর্বাভাস অনুসারে, যুদ্ধের কারণে দেশগুলোর পর্যটন খাত প্রায় ১ হাজার ৬১০ কোটি ডলার হারাতে পারে। 

গাজা যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইয়েমেনের হুথিরা, যা পুরো বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যকে প্রভাবিত করছে। এসঅ্যান্ডপির পূর্বাভাস অনুসারে, সামনে এ আক্রমণ ভারত মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরে প্রসারিত হতে পারে। 

বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইরান সরাসরি যুদ্ধে গেলে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক হুমকি আসবে জ্বালানি তেল খাতে। এর ফল হলো দাম ও বাজারের অস্থিরতা বৃদ্ধি, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতির সব প্রান্তে পড়বে ও মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।