রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। পণ্যের উচ্চ দাম অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে আগ্রাসীভাবে সুদের হার বাড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বেড়ে যাচ্ছে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণের খরচ। এ অবস্থায় জুন-আগস্ট সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে সংকুচিত হয়েছে ব্রিটিশ অর্থনীতি। সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতি মন্দার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ পরিস্থিতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের প্রতিশ্রুতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, নর্থ সির জ্বালানি তেল ও গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দুর্বলতার কারণে আগস্টে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের মাসের তুলনায় দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা আগস্টে জিডিপি শূন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। জুলাইয়ের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানও সংশোধন করে দশমিক ২ শতাংশ কমিয়ে দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আগস্টে শেষে হওয়া তিন মাসে দেশটির জিডিপি দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
পেশাদার পরিষেবা নেটওয়ার্ক কেপিএমজি ইউকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইয়ায়েল সেলফিন বলেন, পারিবারিক বাজেটের ওপর চলমান চাপ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্ভবত চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পরিসংখ্যানে ব্রিটিশ অর্থনীতিতে প্রযুক্তিগত মন্দার চিত্র দেখতে পাব।
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকস জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতির আকার মহামারীপূর্ব অবস্থায় ফিরেছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও পূর্বে জিডিপির আকার মহামারীপূর্ব পর্যায়ের চেয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে অনুমান করা হয়েছিল। আগস্টে উৎপাদন খাত আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। জ্বালানি তেল ও গ্যাস অন্তর্ভুক্ত থাকা নর্থ সিতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রক্ষণাবেক্ষণ খনি ও খনন খাতের কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আগস্টে দেশটির খনি ও খনন খাতের উৎপাদন ৮ দশমিক ২ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
ওএনএসের প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রান্ট ফিজনার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ভোক্তারা খরচের লাগাম টানায় অনেক ভোক্তা-সম্পর্কিত পরিষেবাগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। খুচরা বিক্রি, হেয়ারড্রেসার ও হোটেলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো খারাপ সময় পার করছে।
এদিকে রানী এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে সরকারি ছুটির কারণে গত মাসেও দেশটির অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে ব্রিটিশ অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ধীর হবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ রেকর্ড মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোকে ব্যাপকভাবে আঘাত করেছে এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ডকে দ্রুত সুদের হার বাড়াতে বাধ্য করছে। এমনকি অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও সুদের হার বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে ব্যাংকটি।
অর্থনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যানথিয়ন ম্যাক্রোইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ স্যামুয়েল টম্বস বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবারের হাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সঞ্চয় নেই। পাশাপাশি বন্ধকি ঋণ থাকা ৩০ শতাংশ পরিবারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা ব্যয় কমিয়ে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রকৃত আয় ও করপোরেট মনোভাবে আঘাত এবং ব্যয়ের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং নীতিনির্ধারকরা এখন যে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন তা ইঙ্গিত দেয় যে, মন্দাটি ২০২৩ সালের শেষের আগে শেষ হবে না।
প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস ও অর্থমন্ত্রী কোয়াসি কোয়ার্তেং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তাদের কর কমানোর পরিকল্পনা দেশটির আর্থিক বাজারকে অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কত দ্রুত সুদের হার বাড়াতে তার প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) ২০২৩ সালে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে মাত্র দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়েছে। যদিও দেশটি জার্মানি ও ইতালির অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাসের চেয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। আইএমএফ সতর্ক করেছে, নীতিনির্ধারকরা মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে ভুলভাবে পরিচালনা করলে বিশ্ব অর্থনীতি গভীর মন্দায় ডুবতে পারে। ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও ভোক্তাদের ব্যয় ধীর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। তবে উচ্চ সুদের হার উন্নত অর্থনীতিগুলোয় মন্দার ঝুঁকি এবং দরিদ্র অর্থনীতিগুলোয় ঋণের সংকট বাড়িয়ে তুলছে। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় আসা এখনো বাকি রয়েছে। যদিও অর্থনীতিতে যেটাই ঘটুক না কেন আগামী বছর অনেক মানুষের জন্য মন্দার মতো মনে হবে বলে জানিয়েছে আইএমএফ।










