নতুন বছর ও নতুন দশকের শুরুটা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের বাজারে। বৈশ্বিক মোট জ্বালানি তেলের এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ হওয়া হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে আবারো অস্থির হয়ে উঠতে পারে জ্বালানি পণ্যটির বাজার। এছাড়া ওপেকের উত্তোলন হ্রাস নিয়ে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্রের শেল অয়েলের উত্তোলন প্রবৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের বাজারের চলতি বছর হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও গুরুত্বপূর্ণ বছর। ২০২০ সালে জ্বালানি তেলের বাজার যেসব চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, সেটি বিশ্লেষণ করেছে অয়েলপ্রাইস ডটকম—
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়েছে, যার প্রভাবে এরই মধ্যে চাঙ্গা হতে শুরু করেছে জ্বালানি তেলের বাজার। শুক্রবারের ওই হামলার পর নিম্নমুখী থাকা ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম গত সেপ্টেম্বরের পর নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা আসন্ন দিনগুলোয় আরো বাড়তে পারে। কারণ ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার মাঝখানে রয়েছে ইরাক। জ্বালানি তেলের রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের দ্বিতীয় শীর্ষ উত্তোলনকারী দেশ ইরাক। ফলে ভূরাজনৈতিক এ উত্তেজনার সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে দেশটি। আর ইরান ও ইরাকের জ্বালানি তেল রফতানির জন্য নির্ভর করতে হয় হরমুজ প্রণালির ওপর, যার প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করে ইরান। ফলে ভূরাজনৈতিক এ অস্থিরতায় ইরান এখন হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল সরবরাহে। কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের অন্যতম সরবরাহকারী ইরাক ও ইরান। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মাসে দেশ দুটির সম্মিলিত জ্বালানি তেল উত্তোলনের পরিমাণ ছিল দৈনিক ৬৭ লাখ ব্যারেল, যা ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মোট উত্তোলনের এক-পঞ্চমাংশ। এছাড়া জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ, ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দ্বন্দ্বও চলতি বছরের জ্বালানি তেলের বাজারে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে।
উদ্বৃত্ত সরবরাহ: তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লাগলেও উত্তোলনকারী অন্য দেশগুলোর কারণে বাজারে উদ্বৃত্ত সরবরাহ থাকবে। বিশেষ করে ওপেকবহির্ভূত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, নরওয়ে ও রাশিয়ার উত্তোলন প্রবৃদ্ধি জ্বালানি তেলের বাজারে উদ্বৃত্ত সরবরাহ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ ওপেক ও ওপেকবহির্ভূত কয়েকটি দেশ মিলে গঠিত ওপেক প্লাস জোটের সঙ্গে করা উত্তোলন হ্রাস চুক্তি থেকে চলতি বছর বেরিয়ে যাওয়ার আভাস দিয়েছে রাশিয়া। দেশটি এখন জ্বালানি তেলের বাজারে নিজেদের হিস্যা বাড়াতে উত্তোলন বৃদ্ধিতে নজর দিতে চায়। যে কারণে রাশিয়া থেকেও চলতি বছর জ্বালানি তেলের সরবরাহ অন্যান্য বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এছাড়া একক দেশ হিসেবে জ্বালানি তেলের বাজারে আধিপত্য বাড়াতে উত্তোলন বাড়িয়ে চলেছে ব্রাজিল। এর মধ্যে গত দুই বছরে দেশটিতে আটটি এফপিএসও (ভাসমান অবকাঠামো) চালু হয়েছে, যার প্রত্যেকটির দৈনিক উত্তোলন সক্ষমতা ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। এছাড়া খুব তাড়াতাড়ি আরো কয়েকটি কূপ এসব এফপিএসওর সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় গায়ানা, নরওয়ের সঙ্গে ব্রাজিল যৌথভাবে চলতি বছরে জ্বালানি তেলের উত্তোলন প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে মনে করছে লন্ডনভিত্তিক বাজারবিষয়ক গবেষণা ও তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আইএইচএস মার্কিট।
ওপেকের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের শেল গ্যাস ইন্ডাস্ট্রির আর্থিক মন্দার মধ্যে থাকলেও গ্যাস-সংশ্লিষ্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় উদ্বৃত্ত তৈরি করবে দেশটি। এছাড়া বৈশ্বিক বাজারে উদ্বৃত্ত সরবরাহে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি)। ফলে কমতির দিকে রয়েছে জ্বালানিটির দাম। এলএনজির দাম এভাবে পড়তে থাকলে অনেক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এর সরবরাহ চুক্তি বাতিল করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
আইএমও: জ্বালানি তেলের বাজারে এ বছর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হতে পারে জাহাজে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) নতুন নীতিমালা। এ নীতিমালা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী যেসব জাহাজে স্ক্যাবার (দূষণরোধক যন্ত্র) থাকবে না, সেসব জাহাজে দশমিক ৫ শতাংশের বেশি সালফারযুক্ত জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে না। চলতি বছর থেকে এ নিয়ম কার্যকর হলেও গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩ দশমিক ৫ শতাংশ সালফারযুক্ত জ্বালানি ব্যবহারের অনুমতি ছিল। নতুন এ নিয়মের ফলে এ বছর থেকে বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলে দৈনিক ব্যবহূত ৪০ লাখ ব্যারেল জ্বালানিতে এর প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইএমওর বিধি মেনে চলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন এ বিধির প্রভাব পড়বে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী প্রায় ৫০ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর। ফলে চলতি বছর পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন বাজারের সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি: বিশ্বব্যাপী বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তির দ্রুত বিকাশ ঘটছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর নতুন যেসব জ্বালানি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় অংশই ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি। ২০২০ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মজুদ দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে দেশটি। এছাড়া গত বছর দেশটির কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের সরকার আগামীতে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী নীতিও হাতে নিয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার: জ্বালানি তেলের বাজারে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হতে পারে বৈদ্যুতিক বাড়ির বিকাশ। ইনসাইড ইভিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ১১ মাসে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ১৯ লাখ ৪২ হাজার ছাড়িয়েছে। আর ২০২০ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ির বড় বাজার হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক-২০১৯ অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি ১ কোটিতে পৌঁছতে পারে। আর ২০৪০ সালে এটি বেড়ে ৩ কোটি ছাড়াতে পারে। আর সেটি হলে ২০৪০ সাল নাগাদ দৈনিক ৪০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল ব্যবহারে পরিবর্তন আসতে পারে।
শেল অয়েলের দুর্দিন: কয়েক বছর ধরে জ্বালানি তেলের বাজারে শেল অয়েলের (পাথরের ভাঁজে থাকা জ্বালানি তেল) আধিপত্য বাড়ছে। তবে শেল অয়েল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ঋণভারে রীতিমতো নুয়ে পড়ছে। ২০১৫ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার প্রায় ২০০ জ্বালানি তেল ও গ্যাস কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া চলতি বছর প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার ঋণের মেয়াদ শেষ হবে। ফলে এ বছরও আরো প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হতে পারে। এতে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান উত্তোলন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে পারে।
বাণিজ্যযুদ্ধ: ২০১৯ সালে জ্বালানি তেলের বাজারে মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের বড় প্রভাব ছিল। যদিও বছরের শেষ দিকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ফলে চলতি বছরও জ্বালানি তেলের বাজারে বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব থাকতে পারে।









