মহাবিশ্বকে প্রসারিত করে চলা রহস্যময় শক্তি ডার্ক এনার্জি ধ্রুব নয়, সময়ের সঙ্গে এটি পরিবর্তিত হতে পারে— এমন ধারণা উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (কাসা) এর সহযোগী সদস্য আনোয়ার জামান সজীব।
গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ফিজিকাল রিভিউ ডি তে ‘স্কেলার-ফিল্ড ডার্ক এনার্জি মডেলস: কারেন্ট অ্যান্ড ফোরকাস্ট কন্সট্রেইন্টস’ শিরোনামের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে সহ-লেখক হিসেবে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর এমেরিটাস অধ্যাপক জশুয়া এ. ফ্রিম্যান।
গবেষণাপত্রে তারা দেখিয়েছেন, ডার্ক এনার্জিকে মহাজাগতিক ধ্রুবক ধরে নেয়ার প্রচলিত ধারণা পুরোপুরি সঠিক নাও হতে পারে। গত দুই দশক ধরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ডার্ক এনার্জি একটি স্থায়ী শক্তি যা আইনস্টাইনের প্রস্তাবিত মহাজাগতিক ধ্রুবকের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, এ শক্তি সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে। এর ফলে মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডার্ক এনার্জি দুর্বল হলে মহাবিশ্ব হয়তো ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে অন্ধকারে ঢেকে পড়বে, যাকে বলা হয় ‘বিগ ফ্রিজ’। আবার এ শক্তি বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে গ্যালাক্সি, অণু, পরমাণু এমনকি স্থান-কালও ভেঙে ছড়িয়ে পড়তে পারে, হবে ‘বিগ রিপ’। অন্যদিকে, ডার্ক এনার্জি দুর্বল হয়ে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ থেমে গেলে, মহাকর্ষের টানে সব বস্তু একত্রিত হয়ে ধসে পড়বে, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘বিগ ক্রাঞ্চ’।
তবে সজীব-ফ্রিম্যানের গবেষণায় বলা হচ্ছে, ডার্ক এনার্জি যদি খুব ধীরে পরিবর্তিত হয়, তাহলে সম্প্রসারণ থামবে না। গ্যালাক্সিগুলো ক্রমে দূরে সরে যাবে, নতুন তারার জন্ম হবে না, পুরোনো তারাগুলো নিভে যাবে। একসময় মহাবিশ্ব শীতল, অন্ধকার ও নিষ্ক্রিয় হয়ে চূড়ান্ত স্থবির অবস্থায় পৌঁছাবে, যাকে বলা হয় ‘বিগ ফ্রিজ’ বা তাপ-মৃত্যু।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে আইনস্টাইন ফেলো হিসেবে কর্মরত আনোয়ার সজীব বলেন, তারা যে মডেল ব্যবহার করেছেন তা ১৯৭০-এর দশকে প্রস্তাবিত ‘অ্যাক্সিয়ন’ নামের এক অতিলঘু কাল্পনিক কণার ধারণার ওপর ভিত্তি করে। পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব কমছে। সাম্প্রতিক মহাজাগতিক ইতিহাস বিবেচনায় দেখা যায়, এ সময়ে ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।
এ গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ প্রকল্পগুলোর তথ্য, যেমন ডার্ক এনার্জি সার্ভে (ডিইএস), ডার্ক এনার্জি স্পেকট্রোস্কপিক ইন্সট্রুমেন্ট (ডিইএসআই), স্লোন ডিজিটাল স্কাই সার্ভে (এসডিএসএস)। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডার্ক এনার্জি ধ্রুব নয়— এমন মডেলের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের সামঞ্জস্য বেশি।
সজীব বলেন, গবেষণাপত্রটি বহু বৈজ্ঞানিক দলের সম্মিলিত কাজের ফল। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের গতি ও এর ভবিষ্যৎ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি। আমরা হয়তো সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
কাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও আইইউবির ফিজিকেল সায়েন্সেস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. খান মুহাম্মদ বিন আসাদ বলেন, কাসার পথচলা কেবল শুরু। বাংলাদেশে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানের গবেষণা কার্যক্রম কাসার মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে গবেষণা সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশী বিজ্ঞানীদের সহযোগী সদস্য করে একটি বৈজ্ঞানিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কাসা বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র। এটি উচ্চতর গবেষণা, শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। বর্তমানে নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশের প্রথম রেডিও টেলিস্কোপ তৈরির কাজ করছে কাসা।
গত বছর ডিসেম্বরে কাসার আরেক সহযোগী সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. লামিয়া মওলা নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য ব্যবহার করে ২১ জন বিজ্ঞানীর সঙ্গে মিলে মহাবিশ্বের আদিযুগে গ্যালাক্সির গঠন ও বিবর্তন নিয়ে নতুন ধারণা দেন। সেই গবেষণা প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার এ।
—বিজ্ঞপ্তি










