বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবেলায় একাধিক ফোরামে সম্প্রতি অতিধনীদের ওপর বর্তমান হারের তুলনায় বেশি করারোপের প্রস্তাব এসেছে। এবার শীর্ষ ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট জি২০-এর অর্থমন্ত্রীরা প্রস্তাবটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে একমত হয়েছেন। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত দুদিনের বৈঠক শেষে এক ঘোষণায় তারা বলেন, দেশগুলোর কর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে আমরা উচ্চ নিট সম্পদের মালিকদের ওপর কার্যকরভাবে করারোপ নিশ্চিত করতে পরস্পরকে সহযোগিতা করব। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও আনাদোলু।
আগামী ১৯-২০ নভেম্বর রিওতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জি২০ শীর্ষ সম্মেলন। এর আগে গত শুক্রবার বিলিয়নেয়ারদের ওপর ন্যূনতম ২ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব দিয়েছে ব্রাজিল।
বৈঠকে বিশ্বব্যাপী নির্দিষ্ট হারে করের বিষয়ে একমত হননি মন্ত্রীরা। তা সত্ত্বেও ব্রাজিলের অর্থমন্ত্রী ফার্নান্দো হাদ্দাদ একে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় এ ফল (করারোপে ঐকমত্য) সম্পর্কে আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু এটি সত্যিই আমাদের প্রাথমিক প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।’
জি২০ মন্ত্রীরা বিবৃতিতে বলেন, অতিধনীসহ সব করদাতার জন্য করের ক্ষেত্রে ন্যায্য অবদান রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আক্রমণাত্মক কর বা অতিধনীদের কর ফাঁকি নতুন এ প্রস্তাবের কার্যকারিতা হ্রাস করবে।
ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও অতিধনীদের ওপর করারোপের বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াগতভাবে অস্পষ্ট। কেন না সবাই সহযোগিতার সঙ্গে কাজ করলেও এটি দেশীয় আইনের ভিত্তিতে আরোপ হতে পারে। এ বিষয়ে জি২০ বলছে, প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কর সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করা উচিত বা প্রয়োজনে এ বিষয়ে সাহায্য নেয়া উচিত। তবে কর সংগ্রহের পুরো বিষয়টি হবে বর্তমান দেশীয় আইন অনুসারে।
অতিধনীদের ওপর ব্রাজিলের প্রস্তাবনায় জি২০ দেশগুলোর মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। ফ্রান্স, স্পেন ও দক্ষিণ আফ্রিকা সমর্থন জানালেও বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে মার্কিন অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে একটি কর নীতি সমন্বয় করা খুব কঠিন। আমরা এর কোনো প্রয়োজন দেখি না। সত্যিই মনে করি না যে এ বিষয়ে একটি বৈশ্বিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা বাঞ্ছনীয়।’
এদিকে জি২০ সম্মেলনের আগেই বৈশ্বিক সম্পদের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন প্যারিসভিত্তিক ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান। এ প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে অতিধনীরা সম্পদের দশমিক ৩ শতাংশের সমপরিমাণ কর দিয়ে থাকেন। বিশ্বব্যাপী প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতি বছর ২ শতাংশ হারে কর পেলে এ বাবদ অর্থের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ২০-২৫ হাজার কোটি ডলার। এ অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মতো তহবিলে দেয়া যেতে পারে।
এছাড়া অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের আগে প্রকাশিত অলাভজনক সংস্থা অক্সফামের বিশ্লেষণ অনুসারে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ গত এক দশকে ৪২ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো সম্পদ অর্জন করেছেন, যা অর্থনৈতিক বিবেচনায় বিশ্বের মোট জনসংখ্যার নিচের ৫০ শতাংশ থেকে প্রায় ৩৬ গুণ বেশি।
মন্ত্রী পর্যায়ের এ সম্মেলনে বৈষম্য, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণের ওপর জোর দিয়েছে ব্রাজিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনসিও লুলা দা সিলভা জানান, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জোটের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অতিধনীদের ওপর বর্ধিত করের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশ্বব্যাপী শাসন কাঠামোয় পরিবর্তনের পাশাপাশি টেকসই জ্বালানির ওপরও জোর দেয় ব্রাজিল।
সদস্য দেশগুলো জানিয়েছে, বৈশ্বিক বৈষম্য দূরীকরণের এ প্রস্তাবনা নিয়ে তারা জি২০ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ফোরামে আলোচনা চালিয়ে যাবে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের তথ্যের ওপর নির্ভর করবে তারা।
এদিকে করারোপের প্রতিক্রিয়ায় অতিধনীরা কী করতে পারেন সে বিষয়ে সতর্ক করে দিলেন গবেষণা সংস্থা ব্রাজিলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল থিংকট্যাংকসের সিনিয়র ফেলো অর্থনীতিবিদ রোজারিও স্টুডার্ট। তার মতে, দেশগুলো যদি পৃথক কর নীতি গ্রহণ করে তবে অতিধনীরা তাদের অর্থ ট্যাক্স হেভেন অঞ্চলগুলোয় স্থানান্তর করবে বলে সরকার ভয় পাচ্ছে। সঙ্গে যোগ করেন, ‘যখন সম্মিলিতভাবে কোনো কাজ করা হয়, তখন সবাই জয়ী হয়। কিন্তু বিভক্ত হয়ে কাজ করলে অনেকেই পরাজিত হয়।’
জি২০ মন্ত্রীদের ঐকমত্যকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গ্যাব্রিয়েল জুকম্যান। তিনি জানান, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জি২০ দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি ঐকমত্য হয়েছে।










