এশিয়ার পরিশোধন প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি তেলে আরো মূল্যছাড় দেয়ার দাবি জানিয়েছে রাশিয়ার প্রতি। উন্নত দেশগুলোর জোট জি৭ রুশ জ্বালানি তেলের ওপর প্রাইস ক্যাপ (সর্বোচ্চ মূল্যসীমা) আরোপের পরই এমন দাবি ওঠে। খবর এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্লাটস।

ইউক্রেনে হামলার প্রতিক্রিয়ায় জি৭ রাশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর প্রাইস ক্যাপ আরোপ করে। রুশ জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্য বেঁধে দেয়া হয় ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার। ৫ ডিসেম্বর থেকে প্রাইস ক্যাপ কার্যকর হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যেসব দেশ প্রাইস ক্যাপ ও নিষেধাজ্ঞা দেয়নি, সেসব দেশে জ্বালানি তেলের বাজার সম্প্রসারণে চেষ্টা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে এগিয়ে এশিয়া। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ব্যাপক মূল্যছাড়ে এশিয়ায় জ্বালানি তেল রফতানি করছে রাশিয়া। এবার জ্বালানি তেলের রাশিয়ান বাজার আদর্শ উরাল ক্রুডে মূল্যছাড়ের পরিমাণ আরো বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে এশিয়ান ক্রেতারা।

ভারতের পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ব্যয়, বীমা ও জাহাজীকরণ (সিআইএফ) ভিত্তিতে প্রতি ব্যারেল উরাল ক্রুড আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ ডলার পর্যন্ত মূল্যছাড় সুবিধা উপভোগ করছিল। কিন্তু প্রাইস ক্যাপ কার্যকর হওয়ার পর বাজার আদর্শটিতে মূল্যছাড় আরো বাড়ানোর জন্য রফতানিকারকদের চাপ দিচ্ছে দেশটির ক্রেতারা। বর্তমানে স্পট মার্কেট থেকে সরাসরি উরাল ক্রুড কেনার ক্ষেত্রে ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলার ছাড় দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

বাজার অংশীজনদের কেউ কেউ মনে বলছেন, প্রাইস ক্যাপ কার্যকর হওয়ার পর এমনটা ঘটারই কথা ছিল। এছাড়া ইউরোপ সমুদ্রপথে আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় রাশিয়ার রফতানি গন্তব্য সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দেশটি বর্তমানে জ্বালানি তেল রফতানির ক্ষেত্রে এশিয়ামুখী। আর সেই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে এ অঞ্চলের ক্রেতারা। বিশেষ করে মূল্যছাড় সুবিধার কারণে ভারত দেশটির শীর্ষ জ্বালানি তেল ক্রেতা হয়ে উঠছে।

এদিকে জি৭ ভুক্ত দেশগুলোর দেয়া প্রাইস ক্যাপের তোয়াক্কা করছে না চীন। দেশটি রাশিয়ান ইএসপিও ক্রুড বেঁধে দেয়া ৬০ ডলারের বেশি দামেই কিনছে। নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে এসব জ্বালানি তেল রফতানির ক্ষেত্রে রাশিয়া নিজস্ব ট্যাংকার ও বীমা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে বলে জানা গিয়েছে।

আরগাস মিডিয়ার দেয়া তথ্য বলছে, জানুয়ারিতে সরবরাহ চুক্তিতে চীনে ইএসপিও ক্রুড রফতানি করা হচ্ছে ব্যারেলপ্রতি ৬৭ ডলার ১১ সেন্টে। চীনের বেসরকারি পরিশোধন কেন্দ্রগুলোর বেশ কয়েকটি এরই মধ্যে এ দামে জানুয়ারিতে সরবরাহ চুক্তি সম্পন্ন করেছে।

চীন রাশিয়ার অন্যতম শীর্ষ জ্বালানি তেল ক্রেতা দেশ। দেশটি প্রাইস ক্যাপ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। উল্টো রাশিয়ার সঙ্গে দেশটি অব্যাহত বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ডিসেম্বরে সরবরাহ চুক্তিতে বেসরকারি পরিশোধন কেন্দ্রগুলোয় ইএসপিও ব্যারেলপ্রতি ৬ ডলার ছাড়ে বিক্রি করা হচ্ছে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞার কারণে বেশির ভাগ জ্বালানি তেলের ট্যাংকার মালিক ব্যবসা-বাণিজ্য এড়িয়ে চলছেন। অন্যদিকে যারা ব্যবসা করছেন তারা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকায় অতিরিক্ত চার্জ দাবি করছেন। ফলে একদিকে যেমন ট্যাংকার পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে রাশিয়ার জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যয় পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।

রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ সম্প্রসারণ করেছে ইইউ। ফলে রাশিয়া থেকে আসা জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা, ব্রোকারেজ ও বীমাসহ সব ধরনের পরিষেবা দেয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের কোম্পানিগুলোকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রাইস ক্যাপ ও অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

শিপব্রোকাররা জানান, বাল্টিক সমুদ্র দিয়ে ভারতে জ্বালানি তেল পরিবহনে প্রতি ১০ লাখ ব্যারেলে ৯-১১ ডলার পর্যন্ত চার্জ দিতে হতো। কিন্তু আজকের পর থেকে এটি বেড়ে ১৫ ডলারে উঠে আসতে পারে।

ট্যাংকারস্বল্পতার পাশাপাশি রুশ উৎপাদকদের প্রথাগত ক্রেতা ইইউর পরিবর্তে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে বাজার হিস্যা বাড়াতে হচ্ছে। এটি পরিবহন ব্যয় বাড়াতে বড় ভূমিকা পালন করছে। এদিকে অতিরিক্ত চার্জের কারণে উরাল ক্রুডসহ নিজস্ব জ্বালানি তেল কম দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে রাশিয়াকে। কারণ বিকল্প বাজারগুলোয় অবস্থান ধরে রাখতে দেশটিতে প্রতিযোগিতামূলক দাম ধরে রাখতে হবে।