দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামকে বিজনেস হাব হিসেবে গড়ে তুলতে বিগত সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগে বরাবরই আগ্রহী ছিলেন দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তারা। কিন্তু অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, রিজার্ভ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সহযোগিতার অভাবে এ অঞ্চলে কমেছে বিনিয়োগ নিবন্ধন। সমাপ্ত অর্থবছরে প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য নিবন্ধন নিয়েছে ৮০টি প্রতিষ্ঠান। যেখানে বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিনিয়োগ নিবন্ধন ছিল প্রায় ৫ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার। অর্থাৎ অর্থবছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ২ হাজার ২৭৫ কোটি ৭৯ লাখ ৩১ হাজার টাকা বা ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কভিড-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আবারো নিম্নমুখী হচ্ছে এ অঞ্চলের বিনিয়োগ।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে চলমান নানা সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আস্থার সংকটে পড়েছেন। বিশেষত অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সংকট নিরসন না হলে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের যে সুযোগ ছিল সেটি আর কাজে লাগানো যাবে না।
তবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা সহজীকরণ ও বিভিন্ন লজিস্টিক সুবিধা দেয়া হলে বিনিয়োগ বাড়বে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যমতে, সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিনিয়োগের জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ৮০টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ নিবন্ধন করে। এসব প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ হাজার ৪৫০ কোটি ৪৭ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মোট ৫ হাজার ৬৭৬ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে জানানো হয়। যদিও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০টি প্রতিষ্ঠানের মোট বিনিয়োগ নিবন্ধন ছিল ৫ হাজার ৭২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। তখন মোট কর্মসংস্থান ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৭৩৪ জনের। অর্থাৎ অর্থবছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে ২ হাজার ২৭৫ কোটি ৭৯ লাখ ৩১ হাজার টাকার বা ৩৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে অর্থবছরের ব্যবধানে ২০ প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বেড়েছে ৯৪২ জনের।
এদিকে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১২৭টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ নিবন্ধন ছিল ১ হাজার ৯৬০ কোটি ৪৬ লাখ ৪২ হাজার টাকা এবং কর্মসংস্থান ছিল ১৩ হাজার ৮ জনের। ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১২৪টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ২ হাজার ৪৯৭ কোটি ৬৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং কর্মসংস্থান ছিল ৮ হাজার ৮৬৭ জনের। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ১ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা ও কর্মসংস্থানের জন্য নিবন্ধন নেয়া হয় ১৫ হাজার ৫০২ জনের।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ নিবন্ধনের মধ্যে রয়েছে স্টারলাইন এএমজে হাসপাতালের জন্য ২৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, এবি লাইফ সায়েন্স কোম্পানি ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ৩৮ কোটি টাকা, জেএলএম কনটেইনার সার্ভিস কোম্পানি ডিপো খাতে ২১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
বিনিয়োগ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, গত সরকারের সময়ে চট্টগ্রামকে ঘিরে বিভিন্ন বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যার মধ্যে চট্টগ্রাম ইকোনকিম জোন, বিসিক শিল্প জোন, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প প্রকল্প, কক্সবাজারকে ঘিরে নতুন প্রকল্প, চট্টগ্রামের পতেঙ্গার সঙ্গে আনোয়ারা উপজেলাকে টানেলের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করে ওয়ান সিটি টু টাউন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে ব্যাপক বিনিয়োগ সম্ভাবনা শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস রিজার্ভ কমে যাওয়া, ডলার সংকট, ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস, বিভিন্ন খাতের দুর্নীতিসহ প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট সংকীর্ণ হয়ে আসায় নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন করে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে কিনা সেটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন অনেক বিনিয়োগকারী।
বিডার চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিনিয়োগের নিবন্ধন কিছুটা স্থবির হয়ে আছে। দেশজুড়ে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছেন। তাছাড়া ইকোনমিক জোন ব্যতীত বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় জমি বরাদ্দ পেয়েও অনেকে এখনো অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শুরু করেননি। তবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চট্টগ্রামে নতুন বিনিয়োগ আসবে। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।’
পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবেই বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছেন না দাবি করে বিডার এ কর্মকর্তা বলেন, ‘চট্টগ্রামে সমুদ্রবন্দর থাকায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ হাব হলো এ অঞ্চল। বিশ্বব্যাপী বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে যারা দুই ডিজিটে আছে তাদের পছন্দ করে। আশা করছি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা চট্টগ্রামকে বেছে নেবেন।’










