ফলে স্থানীয় শিল্পগুলো কঠিন সময় অতিক্রম করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। এ অবস্থায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উদ্যোক্তাদের জন্য শাস্তিমূলক না হয়ে সহায়তামূলক হওয়া প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে গতকাল এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় বাণিজ্য সংগঠনটির পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে এ আলোচনায় এমসিসিআই ছাড়াও উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডব্লিউইএবি) প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় এমসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজস্ব নীতি ও প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক পৃথক্করণ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫’ নিয়ে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে গৃহীত না হওয়ায় বিষয়টির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ ও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব প্রশাসনের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করা গেলে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, যা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক হবে। একটি সুপরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা আরো আধুনিক, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় এনবিআর সংস্কারের সামগ্রিক রোডম্যাপ এবং এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
সভায় এমসিসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ই-টিআইএনধারী রয়েছেন এক কোটির বেশি। কিন্তু নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করছেন অর্ধেকেরও কম। এটি দেশের কর কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা। এ বিষয়ে চেম্বারের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও বাজেটে এর প্রতিফলন এখনো নগণ্য।’
সভায় এমসিসিআই নতুন করদাতাদের করভীতি দূর এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে সম্পৃক্ত করতে বছরে ১০০ বা ১ হাজার টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’ প্রবর্তন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ‘ওয়ান-পেজ ডিজিটাল রিটার্ন’ দাখিল ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সমন্বিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও সহজীকরণ পদ্ধতি বাস্তবায়ন হলে করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কর ফাঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
এমসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, বর্তমান ব্যবস্থায় অগ্রিম আয়কর (এআইটি), উৎসে কর (টিডিএস) এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর করহার অনেক ক্ষেত্রে ঘোষিত হারের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে। বিশেষত নগদ লেনদেন-সংক্রান্ত কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কর হ্রাসের সুফল ভোগ করতে পারে না। তাই এ শর্ত প্রত্যাহার করে করপোরেট করহার কমানো এবং টার্নওভারের পরিবর্তে প্রকৃত আয়ভিত্তিক কর ব্যবস্থায় অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে বাণিজ্য সংগঠনটি।
এছাড়া এমসিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকে কর ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর ও পিএসআর সহজীকরণের সুপারিশও করা হয়।
এসএমই খাতের জন্য পৃথক ও সহায়ক কর কাঠামো, টার্নওভার কর হ্রাস, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা এবং কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক যৌক্তিকভাবে কমানোর সুপারিশ করা হয়। বাণিজ্য সংগঠনটি মনে করছে, এর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে ও দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পাবে।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আয়কর রিটার্ন এখন পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। এটি সাধারণ করদাতাদের জন্য সহজ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৪ লাখ ই-রিটার্ন জমা পড়েছে, যেখানে কাগজে রিটার্নের সংখ্যা তিন লাখেরও কম। এতে বোঝা যায় অনলাইন রিটার্ন ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় কর হিসাব, রেয়াত ও করযোগ্য আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়। ফলে ভুল হিসাবের ঝুঁকি কমে গেছে এবং করদাতাদের হয়রানিও কমবে।’
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘উৎসে কর কর্তন (ই-টিডিএস) ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হলে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্জিত আয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে করদাতার রিটার্নে যুক্ত হবে। এতে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া আরো সহজ হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এনবিআরের লক্ষ্য হলো করদাতারা নিজ নিজ অফিস বা বাসা থেকে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেবেন, কর পরিশোধ করবেন এবং অপ্রয়োজনে কর অফিসে যেতে হবে না। একইভাবে কর কর্মকর্তারাও কারণ ছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাবেন না।’
তার ভাষ্যমতে, ‘কর সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসাবান্ধব, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয় এবং করের আওতা বাড়ে।’
আলোচনায় ডব্লিউইএবির পক্ষ থেকে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। সংগঠনটির সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য তিন-পাঁচ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধার দাবি জানান। একই সঙ্গে করবিষয়ক প্রশিক্ষণ আয়োজনের পরামর্শ দেন। এর জবাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট ভ্যাট হার চালুর প্রস্তাব দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। এটি চালু হলে নারী উদ্যোক্তাদের আর ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।










