উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত রাজ্য আসামে ছোট-বড় মিলিয়ে ছয়টি বিমানবন্দর রয়েছে। ভারতের একক কোনো রাজ্যের বিমানবন্দরের সংখ্যা এটাই সর্বোচ্চ। আবার এ রাজ্যেই ভারতে মোট উৎপাদনের অর্ধেক চা উৎপাদন হয়। আর এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে কৃষিপণ্য রফতানির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হতে চায় আসাম। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

ছয়টি বিমানবন্দরের মাধ্যমে রাজ্যটি আন্তঃসীমান্ত বাজারগুলোর সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। এটি আসামকে কৃষিপণ্য রফতানির কেন্দ্রস্থলে পরিণত করতে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আসাম সরকার বিবিএম (বাংলাদেশ, ভুটান ও মিয়ানমার) ও আসিয়ান দেশের বাজারগুলোতে কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ গ্রাহণ করছে এবং তারা বাগান থেকে চা সরাসরি দেশগুলোতে রফতানি করতে চায়।

সনোয়াল বলেন, বিবিএম ও আসিয়ান মিলে ৮০ কোটি মানুষের বাজার। আমাদের আসাম থেকে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে সরাসরি ফ্লাইট রয়েছে। এ বাজারগুলো দখল করতে উপযুক্ত অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এটি শাকসবজির মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্যও রফতানি উপযোগী করে তুলবে।

চা রফতানি বাড়াতে সরকার আসামের বাগানগুলোর মধ্যে মূল্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে সরসরি রফতানি উপযোগী এবং ই-মার্কেট বিস্তৃত করতে কাজ করছে।

লক্ষ্মী টি সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুদ্র চ্যাটার্জি বরেন, বাগানগুলো থেকে বাল্ক চা বিক্রি না করে চা বাগানের মধ্যে এটি প্রক্রিয়াজাত ও প্যাক করা যায়। এছাড়া ই-প্লাটফর্মের মাধ্যমে এগুলো সরাসরি বাজারজাত করা যায়। এটি একদিকে মধ্যস্থতাকারীর প্রচুর খরচ বাঁচাতে পারে এবং অন্যদিকে বাগান মালিকদের ভালো দাম পেতে সহায়তা করতে পারে। আসামে মূল্য শৃঙ্খল আনার জন্য আমরা সরকারের কাছ থেকে ১০ শতাংশ ভর্তুকি চেয়েছি।

তিনি বলেন, মার্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আসাম সরকারের নির্দেশে মহামারী চালাকালীন উদ্যানগুলো উদ্বোধনের পরে লক্ষ্মী টি এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। সংস্থাটি প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ লাখ কেজি চা রফতানি করছে। প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেজিংয়ের ব্যয় বাদ দিয়ে কেজিপ্রতি কাঁচা চা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ রুপি নিয়ে আসছে।

গ্রিন, ওলং, মাসালা, হোয়াইট, রোজ ও অন্যান্য চা প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেজিং হচ্ছে আসামের মোড়ল, নারায়ণপুর, আদাবাড়ি, কেন্দুগিরির চা বাগান ও দার্জিলিংয়ের মোকাবাড়ি টি এস্টেটে। এ ব্যবস্থা অন্যান্য জায়গায়ও শুরু করা যেতে পারে।

সনোয়াল আরো বলেন, হিন্দুস্তান ইউনিলিভার ও ইমামির মতো ব্র্যান্ডগুলো আসামে ইউনিট স্থাপন করেছে এবং সেখানে থেকেই তারা রফতানির সুযোগ খুঁজছে। বহ্মপুত্রের তীরে হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করে একটি লজিস্টিক হাব তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে থাকা বন্দরগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হবে।

জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ইমামির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুশীল আগরওয়াল বলেন, বিবিএম ও আসিয়ান দেশগুলোর বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন হলে শিল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। আর তখন ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (এমএসএমই) মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সহায়তাগুলো বড় শিল্পের জন্য প্রসারিত করা প্রয়োজন।

গত বছর ভারতে ৪ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৩৮ কোটি ৯৭ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছিল। এর মধ্যে আসামে উৎপাদন হয়েছিল ৭১ কোটি ৭০ লাখ কেজি চা। তবে চলতি বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে জারি করা লকডাউনের ধাক্কা লেগেছে আসামের চা উৎপাদনে। শুরুর দিকে রাজ্যটিতে উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। ফলে এ বছর আসামের চা উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যেতে পারে।

আসামের চা শিল্পের বয়স প্রায় ১৮০ বছর। রাজ্যটিতে ৮০৩টি রেজিস্টার্ড চা বাগান ও আরো ১০ হাজারের মতো ছোট চা বাগান রয়েছে। দুটো বিশ্বযুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, অর্থনৈতিক মন্দা, ভয়ংকর ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা পার করে এসেছে এ শিল্প। তবে করোনাকালের মতো আগে কখনই এত বড় উৎপাদন হ্রাস ও লোকসানের মুখে পড়তে হয়নি আসামের চা শিল্পসংশ্লিষ্টদের। সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ২০০ রুপি (ভারতীয় মুদ্রা) হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চা শিল্পের সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনতে আসাম সরকারের পক্ষ থেকে ঋণ ও ভর্তুকি প্রদানসহ চার ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে করোনা মহামারী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিঘাত মোকাবেলা করার জন্য আসামের যেসব চা বাগান বাণিজ্যক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে চাইবে। আসাম সরকার তাদের সেই ঋণের বিপরীতে ৩ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করে দেবে। এক্ষেত্রে বাগানপ্রতি ঋণের পরিমাণ হতে হবে সর্বোচ্চ ২০ লাখ রুপি। মূলত ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ছোট বাগানের লোকসান কমিয়ে আনতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ের সহায়তার অংশ হিসেবে বাগানগুলোকে প্রতি কেজি অথোর্ডক্স চা উৎপাদনের বিপরীতে ৭ রুপি করে ভর্তুকি দেবে আসাম সরকার। এর মধ্য দিয়ে চা উৎপাদন ও রফতানিতে যে মন্দা ভাব বজায় রয়েছে, তাতে কিছুটা হলেও গতি ফিরতে পারে।

তৃতীয় পর্যায়ে চা গাছের চারা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে আসাম সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যের চা বাগান ও কারখানাগুলোকে ২৫ শতাংশ ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ পর্যায়ে আসামের চা শিল্পের জন্য তিন বছর মেয়াদি কৃষি করে অবকাশ সুবিধা দেয়ার কথা জানিয়েছে রাজ্য সরকার।