সাধারণত ধনী ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে বিশেষায়িত ক্রীড়া ইভেন্টের অংশ হয়ে থাকে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো। সাম্প্রতিক বছরে এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের শীর্ষ বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো এখন ব্যাপক হারে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় খেলাধূলার বাজারে সক্রিয় হয়েছে। এমন এক সময়ে ঝোঁকটি সামনে এসেছে, যখন কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক ব্যবসায়িক কৌশল ক্রমেই অতিধনীমুখী হয়ে উঠছে। কারণ গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের গুরুত্ব তুলনামূলক কমছে। খবর এফটি।
ঐতিহ্যগতভাবে পোলো, সেইলিং বা টেনিসের মতো অভিজাত খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ফুটবল ও বাস্কেটবলের মতো গণমানুষের খেলায় ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়েছে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো।
তথ্য পরিষেবাদাতা লাক্সারিনসাইটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপ ও সহযোগিতামূলক চুক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৬টিতে, পাঁচ বছর আগে যা ছিল মাত্র ১৯টি।
চলতি মাসে আবুধাবি গ্রাঁ প্রিতে এ প্রবণতার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ দেখা যায়। সেখানে ফর্মুলা ওয়ানের স্পন্সর হিসেবে এলভিএমএইচের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। একই মাসে মোনাকো গ্রাঁ প্রির টাইটেল পার্টনার হয়েছে কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড লুই ভিতোঁ। গত গ্রীষ্মে স্পেনের ফুটবল জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে অংশীদারত্ব ঘোষণা করে এলভিএমএইচ। একই সঙ্গে ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে দেখা গেছে কোম্পানিটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্র্যান্ড ডিওরের প্রচারণায়।
এ বিষয়ে এলভিএমএইচের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলছেন, ‘দর্শকভিত্তি হিসেবে খেলাধুলা হলো সবচেয়ে বড় মঞ্চ। স্বাভাবিকভাবেই ব্র্যান্ডগুলো এর একটি অংশ চায় এবং ভবিষ্যতেও চাইবে। এসব ব্র্যান্ড শুধু পণ্য বিক্রি করে না, লাইফস্টাইলও বিক্রি করে। শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সঙ্গে যুক্ত হলে সেই লাইফস্টাইলের ছবি অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।’
সাম্প্রতিক দশকে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলো শুধু অতিধনীদের জন্য বিশেষায়িত নয়। বরং মাল্টিবিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক করপোরেশনে রূপান্তরিত হওয়ায় প্রয়োজন হয়েছে বিস্তৃত গ্রাহকভিত্তি। এ কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিলাসবহুল পণ্যগোষ্ঠীটি খেলাধুলার সঙ্গে জোট বাঁধার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
লাক্সারিনসাইটের প্রধান নির্বাহী জনাথন সিবোনি বলেন, ‘আজকের দিনে বিলাসিতা আর শুধু ভিআইপি গ্রাহকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এক ধরনের গণতান্ত্রিক বিলাসিতা হয়ে উঠেছে। বড় ব্র্যান্ডগুলোর আকার ও পরিপক্বতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে তাদের আরো বড় গ্রাহকভিত্তির দিকে মনযোগ দিতে হচ্ছে।’
তবে গণমানুষের খেলায় প্রবেশের প্রবণতা এমন এক সময়ে দেখা যাচ্ছে, যখন টানা মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোকে আবার ধনী গ্রাহকদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে।
বিলাসবহুল পণ্যবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ট্রিনিটি এশিয়ার অ্যালেক্সিস বঁহোমের মতে, আগে ব্র্যান্ডগুলো ক্রেতাদের সামাজিক শ্রেণী উত্তরণের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিত। এখন সে মডেল অনুসরণ করছে না কোম্পানিগুলো। বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে সর্বোচ্চ ব্যয় ক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাহকরা। কারণ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত ক্রেতারা চাপের মুখে রয়েছে।
অন্যান্য বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের মধ্যেও গণমানুষের খেলায় প্রবেশের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রালফ লরেন ২০২৪ সালের অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রের দলকে পোশাক সরবরাহ করেছে। প্রাদা চীনের নারী ফুটবল দলের অফিশিয়াল পার্টনার এবং মঁক্লের ইন্টার মিলানের জন্য মাঠের বাইরের পোশাক তৈরি করেছে।
১৯৭০-এর দশকের পারিবারিক ব্যবসা ছিল লুই ভিতোঁ। ব্যাপক প্রচার কৌশলই কোম্পানিটিকে আনুমানিক ২ হাজার ২০০ কোটি ইউরো বিক্রির বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত করেছিল। লুই ভিতোঁর মতো ১ হাজার কোটি ইউরোর বেশি আয়সম্পন্ন মেগা ব্র্যান্ডগুলো ভবিষ্যতে কীভাবে প্রবৃদ্ধি বজায় রাখবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সে প্রশ্ন তুলছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।
এইচএসবিসির বিশ্লেষক এরওয়ান রঁবুর বলেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে লুই ভিতোঁর চুক্তি কারো কাছে একটু বেশি লো-এন্ড মনে হতে পারে। কিন্তু অনেকের কাছেই এটা স্বপ্ন, এ খেলোয়াড়দের কেউ কেউ তো অ্যাবসোলিউট স্টার। এত বড় একটি ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে কী কাজ করা যায়, তা বোঝার জন্য অনেক কিছুই চেষ্টা করে দেখতে হয়।’









