সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম লঙ্ঘন করে বিনিয়োগ করেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড। অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে লিখিত চুক্তিও করা হচ্ছে না। আর এ বিনিয়োগের বিপরীতে কোনো প্রকার প্রভিশন সংরক্ষণ না করে সম্পদ ও মুনাফা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে কোম্পানিটি। এছাড়া নিজস্ব সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানেও কোম্পানিটি নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত বিনিয়োগ করেছে। জীবন বীমা খাতের এ কোম্পানির নিরীক্ষক মাহফেল হক অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস তার মতামতে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নিয়ম অনুসারে কোনো জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান তার পলিসিধারী দায় বা বীমাকারীর সম্পদের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত অস্থানান্তরযোগ্য সম্পদে বিনিয়োগ করতে পারবে। কিন্তু প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এক্ষেত্রে ২০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ করেছে। ২০২১ সাল শেষে অস্থানান্তরযোগ্য সম্পদে কোম্পানিটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৭৭ কোটি ৭৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। যদিও ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত ২০২০ সালের হিসাবে বীমাকারীর সম্পদের ২০ শতাংশ হচ্ছে ১৬৮ কোটি ৬৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার তুলনায় ১০৯ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেশি বিনিয়োগ করেছে।
কোম্পানিটি সর্বশেষ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে পিএফআই সিকিউরিটিজে তাদের ১৬৭ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার টাকা স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ রয়েছে। মূলত ২০১৮ সাল থেকেই এ বিনিয়োগ বকেয়া হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এ বিনিয়োগের বিপরীতে লিখিত কোনো চুক্তিও হয়নি। এ বিনিয়োগের অর্থ আদায়ে কোম্পানিটি হাইকোর্টে মামলা করেছে। একইভাবে কোম্পানিটি সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদনে স্টার্লিং গ্রুপে ১৫ কোটি টাকা স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ দেখিয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে এ বিনিয়োগও বকেয়া দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়েও কোনো লিখিত চুক্তি নেই। কোম্পানিটি এ অর্থ আদায়েও হাইকোর্টে মামলা করেছে। এ দুই কোম্পানিতে করা বিনিয়োগের বিপরীতে কোম্পানি কোনো সঞ্চিতি সংরক্ষণ না করায় তাদের সম্পদ ও মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে বলে মনে করছেন নিরীক্ষক। এছাড়া কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ থেকে বাংলালায়নে জিরো কুপন বন্ড হিসেবে ৪ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। এ বিনিয়োগ ১০ শতাংশ হারে রূপান্তরযোগ্য। কিন্তু কোম্পানিটির সর্বশেষ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে পুরো বিনিয়োগের অর্থই বকেয়া দেখানো হয়েছে। এখানে এ বিনিয়োগের অর্থ আদায় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষক। একই সঙ্গে এক্ষেত্রেও কোনো প্রভিশন সংরক্ষণ না করায় সম্পদ ও মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন।
নিরীক্ষক আরো জানিয়েছেন, জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোম্পানিটি নিজস্ব সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে তার পলিসিধারীর দায় বা
বীমাকারীর সম্পদের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। ২০২১ সাল শেষে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজে কোম্পানিটির বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৮৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যদিও ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ সালের হিসাবে ১০ শতাংশ হারে এ বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ৮৪ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কোম্পানিটি এক্ষেত্রে নির্ধারিত সীমার তুলনায় ৩ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি বিনিয়োগ করেছে। কোম্পানিটি তার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ লিমিটেডে ৬৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ দেখিয়েছে। সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রাইম ইসলামী লাইফের ১৯ কোটি ২৯ লাখ ৯০ হাজার লভ্যাংশ বাবদ পাওনা রয়েছে। এ পাওনা ২০১৮ সাল থেকেই দেখিয়ে আসছে কোম্পানিটি। অবশ্য সর্বশেষ হিসাব বছরে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটি থেকে লভ্যাংশ হিসাবে ১ কোটি টাকা আদায় দেখানো হয়েছে। যদিও অর্থ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে নিরীক্ষক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কেননা সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটি আলোচ্য হিসাব বছর বাদে এর আগের দুই বছর যাবৎ লোকসানে রয়েছে। একই সঙ্গে সর্বশেষ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটিতে ৮৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার টাকা স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে কোম্পানিটির প্রকৃত বিনিয়োগ ছিল ৭৯ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ১১ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা লভ্যাংশ হিসাবে বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। যা একত্রিতভাবে ৯০ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার টাকা হয়। এখান থেকে ৩ কোটি টাকা আদায় হিসেবে দেখিয়েছে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
এছাড়া নিয়ম অনুসারে জীবন বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো কোম্পানির পলিসিধারী দায় বা বীমাকারীর সম্পদের ন্যূনতম ৩০ শতাংশ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের বিধান রয়েছে। ৩০ শতাংশ হিসাবে এ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫৩ কোটি টাকা। কিন্তু কোম্পানিটি এক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছে ১৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বিনিয়োগে ঘাটতি রয়েছে ২৩৫ কোটি ৩২ লাখ ১০ হাজার টাকা।









