রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) দেশের পুঁজিবাজারের পরিবর্তিত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারভিত্তিক, প্রতিযোগিতামূলক, দক্ষ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের তাগিদ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে টেকসইভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলেও মনে করেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে আইসিবির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনো দলীয় লোক দিচ্ছি না, দেবও না। আমার ওপর চাপ থাকা সত্ত্বেও দেব না। এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। দেশের আর্থিক খাতকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবে। এ খাতের উন্নয়নে যা যা করা প্রয়োজন, সরকার তা করবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রেখে দক্ষতা ও পেশাদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাজারভিত্তিক ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেয়া এবং পুঁজিবাজারকে এর অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আইসিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে জানান অর্থমন্ত্রী। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানোই ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মূল উদ্দেশ্য। তবে সময়ের সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারের কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় আইসিবিকেও নিজেদের কার্যক্রম নতুনভাবে সাজাতে হবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো অনেকটা খুচরা বা রিটেইল বিনিয়োগকারীনির্ভর। বিপরীতে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেশি। রিটেইলনির্ভর বাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর করে তুলতে আইসিবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

আইসিবিকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে। কোনো পেপারভিত্তিক লেনদেন থাকা উচিত নয়।’

বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অনলাইন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনলাইন লিস্টিং এবং লিস্টিং আবেদনসহ সব প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসবে এবং বিনিয়োগ করবে। এর মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরো সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।’

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত একটি ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ওই বৈঠকে ১৫টি বড় কোম্পানি অংশ নেয়, যাদের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার। সেখানে প্রাইভেট ফান্ড, প্রাইভেট ফান্ডিং ও ডেরিভেটিভসহ বিভিন্ন আর্থিক পণ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে। তাদের জন্য দেশের বাজারকে প্রস্তুত করতে হবে।’

আইসিবির আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে সরকার এরই মধ্যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে উল্লেখ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ‘অর্থ বিভাগ থেকে দুই দফায় আইসিবিকে মোট ৪ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। প্রথম দফায় দেয়া ৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করা হয়। বাকি ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আইসিবি প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা আয় করেছে। পরবর্তী সময়ে দেয়া আরো ১ হাজার কোটি থেকে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। যথাযথ বাজার বিশ্লেষণ ছাড়া বিনিয়োগ এবং উচ্চ সুদে অর্থ নিয়ে বিনিয়োগ করা আইসিবির বর্তমান সমস্যাগুলোর অন্যতম কারণ। এ কারণে পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে আইসিবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অনেক দক্ষ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় আইসিবিকে আরো পেশাদার হতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ পুনর্বিন্যাস, স্বচ্ছ রিপোর্টিং এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ভবিষ্যতে বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল, এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ), সুকুক, করপোরেট বন্ড, সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি), ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (সিআইপি), রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (আরইআইটি) এবং অবকাঠামো অর্থায়নের মতো খাতে আইসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সুশাসনে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। পরিবর্তিত বাজার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইসিবিকে আরো আধুনিক, দক্ষ ও বহুমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

আইসিবির সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। এছাড়া অনুষ্ঠানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আইসিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ।