বিভিন্ন পণ্য ও খাতভিত্তিক রফতানি আয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় রফতানি ট্রফি বিতরণ হয়েছে গতকাল। ২০২০-২১ অর্থবছরের রফতানি আয়ের জন্য এ স্বীকৃতি পেয়েছে দেশের মোট ৭৩টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। রফতানি আয়ের ভিত্তিতে এ বছর সেরা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশেষভাবে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রফতানি ট্রফি’ পেয়েছে হা-মীম গ্রুপের রিফাত গার্মেন্টস লিমিটেড।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় রফতানি ট্রফি ২০২০-২১ প্রদান অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাতে ট্রফি তুলে দেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। হা–মীম গ্রুপের অন্য প্রতিষ্ঠান হা–মীম ডেনিম লিমিটেড টেক্সটাইল ফ্যাব্রিকস খাতে জাতীয় রফতানি ট্রফি (স্বর্ণ) পেয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে এ পুরস্কার নেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক সাজিদ আজাদ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান।

সেরা রফতানিকারক ট্রফি অর্জন নিয়ে হা-মীম গ্রুপের এমডি এ কে আজাদ জানান, ‌হা-মীম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রফতানি ট্রফি পাওয়ায় তিনি আনন্দিত ও গর্বিত। এজন্য তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইপিবি এবং হা-মীম গ্রুপের সব শ্রমিক, কর্মকর্তা–কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। 

ব্যবসা পরিবেশ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, ‘কাস্টমস তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ দিচ্ছে। এইচএস কোড বলতে তারা কিছু মানে না। তারা যেটা বলবে সেটাই এইচএস কোড, যার ওপরই শুল্ক দিতে হবে। এরপর মিথ্যা ঘোষণার অজুহাতে জরিমানাও আরোপ করবে। এসব ক্ষেত্রে এনবিআর অন্যায় করছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের শিল্পায়ন হবে না, কর্মসংস্থানও হবে না। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে হবে।’ 

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা। এরই মধ্যে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু সেখানে বিনিয়োগ হচ্ছে না। কারণ ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে করা বিনিয়োগ নিয়েই খুব অসহায় অবস্থায় রয়েছে। তাই আর নতুন করে বিনিয়োগে যেতে চাচ্ছেন না। স্থানীয় বিনিয়োগ না হলে বিদেশী বিনিয়োগও আসবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার ৪০ শতাংশ কম মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং ৩০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি হয়েছে। ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন না হলে বিনিয়োগ হবে না। নতুন কর্মসংস্থান হবে না। এতে বেকারত্বের হার আরো বেড়ে যাবে।’ তিনি মনে করেন, এফবিসিসিআইসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে দেশে চলমান হরতাল-অবরোধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এভাবে হরতাল-অবরোধ চলতে থাকায় বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রফতানিতে বর্তমানে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, আগামীতে তা আরো বেড়ে যাবে।  

অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘‌গত এক দশকে দেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হলেও রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তাতে কিছুটা ছেদ পড়েছে। এ কারণে বর্তমানে কিছুটা ডলার সংকট দেখা দিয়েছে। এ সংকট থেকে উত্তরণে রফতানি ও রেমিট্যান্স বাড়ানোর বিকল্প নেই। রফতানি বাড়াতে ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সব ধরনের নীতি সহায়তা দেয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করা যাবে না। রফতানিযোগ্য আরো অনেক পণ্য আছে। যত বেশি পণ্য রফতানিতে অন্তর্ভুক্ত হবে, রফতানি আয় তত বাড়বে। সার্বিক বাণিজ্যের কলেবর ততই বাড়বে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশ সমৃদ্ধি লাভ করবে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব হবে। পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারলেই ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রফতানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।’

তৈরি পোশাকের ওভেন পণ্যে স্বর্ণ ট্রফি পেয়েছে স্নোটেক্স আউটওয়্যার লিমিটেড, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি যথাক্রমে একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড ও তারাশিমা অ্যাপারেলস লিমিটেড।

তৈরি পোশাকের নিটওয়্যার পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো যথাক্রমে ফ্লামিংগো ফ্যাশনস লিমিটেড, জিএমএস কম্পোজিট নিটিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং লিবার্টি নিটওয়্যার লিমিটেড। সব ধরনের সুতা পণ্য শ্রেণীতে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে বাদশা টেক্সটাইলস লিমিটেড, স্কয়ার টেক্সটাইলস লিমিটেড ও এনজেড টেক্সটাইল লিমিটেড।

টেক্সটাইল ফ্যাব্রিক্স পণ্য শ্রেণীতে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে হা-মীম ডেনিম লিমিটেড, এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড ও আকিজ টেক্সটাইলস মিলস লিমিটেড। হোম ও স্পেশালাইজড টেক্সটাইল পণ্য শ্রেণীতে স্বর্ণ ও রৌপ্য ট্রফি পাওয়া প্রতিষ্ঠান হলো যথাক্রমে জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফ্যাব্রিক্স লিমিটেড ও মমটেক্স এক্সপো লিমিটেড। টেরিটাওয়েল পণ্য খাতে স্বর্ণ ট্রফি পেয়েছে নোমান টেরিটাওয়েলস মিলস লিমিটেড। 

কাঁচাপাট পণ্য খাতে স্বর্ণ ও রৌপ্য ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে ইন্টারন্যাশনাল জুট ট্রেডার্স ও মেসার্স সারতাজ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। পাটজাত পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো যথাক্রমে আকিজ জুট মিলস লিমিটেড, জনতা জুট মিলস লিমিটেড ও জোবাইদা করিম জুট স্পিনার্স লিমিটেড। চামড়াজাত পণ্যে স্বর্ণ ও রৌপ্য ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে পিকার্ড বাংলাদেশ লিমিটেড ও এবিসি ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ফুটওয়্যার পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে বে-ফুটওয়্যার লিমিটেড, সনিভার্স ফুটওয়্যার লিমিটেড এবং অ্যালায়েন্স লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার লিমিটেড।

তামাক ব্যতীত কৃষিজ পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে ইনডিগো করপোরেশন, মনসুর জেনারেল ট্রেডিং কোং লিমিটেড ও হেরিটেজ এন্টারপ্রাইজ। তামাকজাত পণ্য ব্যতীত অ্যাগ্রোপ্রসেসিং পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে প্রাণ ডেইরি লিমিটেড, হবিগঞ্জ এগ্রো লিমিটেড ও এলিন ফুড প্রডাক্টস লিমিটেড।

ফুল-ফলিয়েজ পণ্যে স্বর্ণ ও রৌপ্য ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে মেসার্স রাজধানী এন্টারপ্রাইজ ও এলিন ফুডস ট্রেড। হস্তশিল্পজাত পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড, বিডি ক্রিয়েশন ও ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেইড প্রডাক্টস বিডি। মেলামাইন পণ্যে স্বর্ণ ট্রফি পেয়েছে ডিউরেবল প্লাস্টিক লিমিটেড। প্লাস্টিক পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি যথাক্রমে বেঙ্গল প্লাস্টিকস লিমিটেড (ইউনিট-৩), অলপ্লাস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড এবং বেঙ্গল পলি অ্যান্ড পেপার স্যাক লিমিটেড (ইউনিট-২)।

সিরামিক সামগ্রী পণ্যে স্বর্ণ ও রৌপ্য ট্রফি জিতেছে যথাক্রমে শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড ও আর্টিসান সিরামিকস লিমিটেড। লাইট ইঞ্জিরিয়ারিং পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো যথাক্রমে মেসার্স মেঘনা বাংলাদেশ লিমিটেড, রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (ইউনিট-২) এবং মেসার্স ইউনিগ্লোরি সাইকেল কম্পোনেন্টস লিমিটেড। ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।

অন্যান্য শিল্পজাত পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে মেরিন সেফটি সিস্টেম, এশিয়া মেটাল মেরিন সার্ভিস লিমিটেড ও বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড। ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। কম্পিউটার সফটওয়্যার পণ্যে স্বর্ণ ও রৌপ্য ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে সার্ভিস ইঞ্জিন লিমিটেড ও গোল্ডেন হার্ভেস্ট ইনফোটেক লিমিটেড। রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডভুক্ত শতভাগ বাংলাদেশী মালিকানাধীন (‘সি’ ক্যাটাগরি) তৈরি পোশাক শিল্পের নিট ও ওভেন পণ্যে স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ ট্রফি পেয়েছে যথাক্রমে ইউনিভার্সেল জিন্স লিমিটেড, প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড ও এনএইচটি ফ্যাশন লিমিটেড।