বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান রয়েছে মূল্যস্ফীতি। বাড়ানো হচ্ছে সুদের হার। আর্থিক বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ছে। পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও কভিডজনিত অনিশ্চয়তার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। জেঁকে বসছে মন্দার ঝুঁকিও। এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলন (আঙ্কটাড)।
আঙ্কটাডের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২২- এ বলা হয়েছে, ২০২১ সালে প্রাক-মহামারী পর্যায়ে পুনরুদ্ধারের পরে বিশ্বজুড়ে এফডিআই প্রবাহ কমে যেতে পারে। সবচেয়ে ভালো আশা করলে এটি সমতল থাকতে পারে। এক্ষেত্রে কারণ হিসেবে সংস্থাটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবং কভিডজনিত প্রতিবন্ধকতা অব্যাহত থাকার বিষয়টিকে দায়ী করেছে। এরই মধ্যে প্রধান অর্থনীতিগুলোয় সুদের হার বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক বাজার নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব এবং একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা এফডিআই প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্প্রসারণ (গ্রিনফিল্ড) সম্পর্কিত চুক্তিগুলো গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ কমে গিয়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে আন্তঃসীমান্ত একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ (এমঅ্যান্ডএ) কার্যক্রম ১৩ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক প্রকল্পে অর্থায়ন ৪ শতাংশ পতন হয়েছে। এ পরিসংখ্যান বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি এড়িয়ে চলার বিষয়টিকে প্রতিফলিত করছে।
উচ্চমুনাফা সত্ত্বেও ২০২১ সালে বিদেশে নতুন প্রকল্পে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ প্রাক-মহামারী পর্যায়ের ২০ শতাংশ নিচে ছিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অর্থের হিসেবে গ্রিনফিল্ড চুক্তি সমতল ছিল। ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও আন্তঃসীমান্ত বিনিয়োগের জন্য বৈশ্বিক পরিবেশ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ও মহামারীর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিভিন্ন দেশে খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থ সংকট সৃষ্টি করছে।
ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্স রিফর্মস অ্যান্ড সাসটেইনেবল ইনভেস্টমেন্ট শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী এফডিআই প্রবাহ বেড়ে ১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ বিনিয়োগের পরিমাণ ২০২০ সালের চেয়ে ৬৪ শতাংশ বেশি। মহামারীর প্রথম বছরে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ কমে ১ লাখ কোটি ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। গত বছর সব অঞ্চলেই এফডিআই প্রবাহ বেড়েছে। আঙ্কটাড বলেছে, ২০২১ সালের বৃদ্ধির গতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা নেই। ২০২২ সালে বৈশ্বিক এফডিআই প্রবাহ সম্ভবত নিম্নগামী হবে। সবচেয়ে ভালো আশাবাদ করলেও সেটি সমতল হবে। তবে মূল্যের দিক থেকে এফডিআই তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রকল্পের কার্যক্রম আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক স্ট্যাগফ্লেশন (উচ্চমূল্যস্ফীতি, কর্মহীনতা ও শ্লথ প্রবৃদ্ধি) নিয়ে সতর্ক করেছে এবং দ্বিতীয়বারের মতো চলতি বছরের বিশ্ব অর্থনীতির পূর্বাভাস কমিয়ে এনেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। এ হার গত এপ্রিলের দেয়া ৩ দশমিক ২ শতাংশের অনুমান থেকে কম। কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘসময় ধরে দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করেছে।
যদিও এফডিআই পতনের পেছনে কেবল যুদ্ধ এককভাবে দায়ী নয়। আঙ্কটাড জানিয়েছে, যুদ্ধের পাশাপাশি চীনের কভিডজনিত লকডাউন সরবরাহ চেইনের প্রতিবন্ধকতা বাড়িয়ে তুলেছে। এ কারণে সরবরাহ চেইন সম্পর্কিত শিল্পগুলোয় গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য প্রধান অর্থনীতিতে সুদের হার বাড়ার কারণে চলতি বছরের শেষ দিকে এমঅ্যান্ডএ কার্যক্রম ধীর হতে পারে। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পে অর্থায়ন বৃদ্ধিকেও থমকে দিতে পারে। এর বাইরে আর্থিক বাজার নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব এবং ক্রমবর্ধমান মন্দার লক্ষণ এফডিআই প্রবাহের পতনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।










