বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেছেন, দেশের স্টক এক্সচেঞ্জগুলো
তাদের নিজেদের শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার (সেলফ লিস্টিং) আগ পর্যন্ত ডিমিউচুয়ালাইজেশন
(ব্যবস্থাপনা থেকে মালিকানা পৃথকীকরণ) প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে না। তাই
যত দ্রুত সম্ভব স্টক এক্সচেঞ্জের সেলফ লিস্টিং করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)
আয়োজিত ‘স্টক ব্রোকার্স পারফর্মেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৩ অ্যান্ড সেলিব্রেশন ফর বিকামিং
এ মেম্বার অব এশিয়া সিকিউরিটিজ ফোরাম’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি
এসব কথা বলেন।
ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে
উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার অধ্যাপক
ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ও মো. আব্দুল হালিম এবং ঢাকা স্টক
এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাফিজ মুহাম্মদ হাসান বাবু। এছাড়া অনুষ্ঠানে
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এটিএম তারিকুজ্জামানসহ ডিএসইর সদস্য ও পুঁজিবাজারের অংশীজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে গত বছর পুঁজিবাজারে লেনদেনের ভিত্তিতে ডিএসইর শীর্ষ ২০
ব্রোকারেজ হাউজকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। এর মধ্যে লেনদেনে সবার সেরা হয়েছে ইউসিবি
স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড। দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছে লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ লিমিটেড। ব্র্যাক
ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেড পেয়েছে তৃতীয় পুরস্কার। সেরা ব্রোকারদের তালিকার চতুর্থ
স্থানে রয়েছে ইবিএল সিকিউরিটিজ লিমিটেড। আর পঞ্চম পুরস্কার পেয়েছে শেলটেক ব্রোকারেজ
লিমিটেড। শীর্ষ ২০ ব্রোকারের তালিকায় থাকা বাকি ব্রোকারহাউজগুলোর মধ্যে আইডিএলসি সিকিউরিটিজ
লিমিটেড ষষ্ঠ পুরস্কার, সিটি ব্রোকারেজ লিমিটেড সপ্তম পুরস্কার, শান্তা সিকিউরিটিজ
লিমিটেড অষ্টম পুরস্কার, ব্যাংক এশিয়া সিকিউরিটিজ লিমিটেড নবম পুরস্কার এবং আইসিবি
সিকিউরিটিজ ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড দশম পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত বাকি ১০
ব্রোকারেজের মধ্যে রয়েছে এনআরবিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এমটিবি সিকিউরিটিজ লিমিটেড,
ইউনাইটেড ফাইন্যান্সিয়াল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড, বিডি সানলাইফ সিকিউরিটিজ লিমিটেড,
রয়্যাল ক্যাপিটাল লিমিটেড, প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ লিমিটেড, এআইবিএল ক্যাপিটাল মার্কেট
সার্ভিসেস লিমিটেড, ইউনাইটেড সিকিউরিটিজ লিমিটেড, আইআইডিএফসি সিকিউরিটিজ লিমিটেড এবং
বিডি ফাইন্যান্স সিকিউরিটিজ লিমিটেড।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম
টিটু বলেন, ডিএসইর শীর্ষ-২০ ব্রোকারকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি ভালো উদ্যোগ। এটি অন্যদেরও
উৎসাহিত করবে এবং এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে। আমি ১৯৯২ সালে অথরাইজড রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে
পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। ফলে ডিএসইর সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আজকে ডিএসইর
চেয়ারম্যান বলেছেন ব্রোকারদের বাঁচাতে হবে। কিন্তু আমি বলতে চাই ব্রোকাররা ভালো থাকলে
ডিএসই ভালো থাকবে। আমাদেরকে সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। এটি ব্রোকারদেরই
করতে হবে। পুঁজিবাজারে পুঁজি নিয়ে আসতে হবে। ধার করা অর্থ দিয়ে পুঁজিবাজার চলে না।
আমাদের পুঁজিবাজারে এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে ডিমিউচুয়ালাইজেশন বাস্তবায়িত হয়নি। ডিএসইর ৩৫
শতাংশ শেয়ার অফলোড না করা পর্যন্ত এটি প্রকৃতপক্ষে ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জ হবে
না। এখানে বিএসইসির কমিশনাররা আছেন আমি তাদের অনুরোধ করব তারা যাতে স্টক এক্সচেঞ্জের
সেলফ লিস্টিংয়ের ব্যবস্থা করে দেন। এটি বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে নতুন মাত্রা যোগ
হবে।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমি যখন পুঁজিবাজারে আসি তখন সিকিউরিটিজ
অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ছিল না। তখন মার্চেন্ট ব্যাংক ছিল না, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি
ছিল না। ব্রোকাররা নিজেরাই সব ছিল। তারাই এক্সচেঞ্জের মালিক ছিল, তারা আইপিও ইস্যু
আনত, তারা নিজেরাই তহবিল ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছু করত। এত রেগুলেশনের পর দীর্ঘ দিনে আমাদের
অর্জনটা কী হলো? শুধুমাত্র আমলাতান্ত্রিক অনেকগুলো স্তর হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের
যে জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল সেখানে নিজেদের নিয়ে যেতে পারিনি। আমাদের এখানে পুঁজিবাজার
কখনোই মূল অর্থনীতিকে প্রতিনিধিত্ব করে না। গত ৫২ বছরে আমাদের ক্যাপিটাল ফর্মেশন হয়নি।
এখনো আমাদের শিল্প, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করে ব্যাংকের ওপর। এমনকি আমাদের
পুঁজিবাজারও নির্ভর করে ব্যাংকের টাকার ওপর। আমাদের এ জায়গা থেকে বের হয়ে আসবে হবে।
পুঁজিবাজারের নির্যাস হচ্ছে এর লেনদেন ও মূল্য উদঘাটন উল্লেখ করে
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, শেয়ারের দাম ও সূচক বাড়ল বা কমল এটি শুধু অর্থনীতির ভাষায়
ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য। শুধু বাজার বা সূচক বাড়বে এ রকম দায়িত্ব যারা নেয় বা দায়িত্ব
নিয়ে চিন্তা করে তাদের কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে বলব এভাবে বাজার সামনের দিকে এগিয়ে যেতে
পারবে না। কত ধরনের বৈচিত্র্যময় পণ্য আছে সেটি হচ্ছে পুঁজিবাজারের নির্যাস। কত কিছুর
সুযোগ আছে। এ সুযোগগুলো কাজে লাগিয়ে বাজার বড় করতে হবে। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের প্রথম বিষয়ই
ছিল যে আমরা যারা মালিকানায় আছি তারা সরে যাব, স্বতন্ত্র পরিচালকরা পর্ষদের দায়িত্ব
নেবেন। তারা সিদ্ধান্ত নেবেন যে বাজারে কী পণ্য থাকবে। পণ্য ডিএসইর, লেনদেন হবে ডিএসইতে
কিন্তু এখানে কোনো পণ্য চলবে কী চলবে না সেটি ঠিক করে দেবে আরেকজন, আমি মনে করি এটি
পুঁজিবাজারের প্রথম প্রতিবন্ধকতা। ডিএসইতে যত বেশি পণ্য আসবে তত বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ
বাড়বে। যত বেশি গ্রামীণফোনের মতো কোম্পানি আসবে তার সঙ্গে বিনিয়োগকারীও আসবে। যখন একটি
নতুন কোম্পানি আসে তার সঙ্গে নতুন বিনিয়োগকারীও আসে।
বিএসইসি ও ডিএসইর মধ্যে সহযোগিতার তাগিদ দিয়ে আহসানুল ইসলাম টিটু
বলেন, ডিএসই নিজেই একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আর বিএসইসি সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক
সংস্থা। একটি গণ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আইন পাস হয়ে যাবে কিন্তু কোনো আলোচনা হবে না এটি ঠিক
নয়। বিএসইসি ও ডিএসইর মধ্যে পরামর্শমূলক সহযোগিতা থাকতে হবে। তা না হলে পুঁজিবাজার
বড় হতে পারবে না। এটি শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বের পুঁজিবাজারের জন্যই প্রযোজ্য।
আমাদের ব্যাংকিং খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে কিছু সমস্যা আছে। পুঁজিবাজারে ঋণাত্মক
ইকুইটির সমস্যা আছে। যত সমস্যাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে তত সেখান থেকে বের হতে পারব না।
অনেকগুলো ইস্যু আছে আমরা ঝুলিয়ে রেখেছি। এটি অনেকটা টিউমারের মতো, এটিকে যদি রেখে দেয়া
হয় তাহলে এক সময় শরীরে ক্যান্সার দানা বাধবে। যন্ত্রণাদায়ক হলেও টিউমারকে সার্জারির
মাধ্যমে অপসারণ করাই মঙ্গলজনক। বিএসইসি, ডিএসই এবং ব্রোকার হলো পুঁজিবাজারের তিনটি
স্বত্তা। এর সঙ্গে যেসব সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে যেমন সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি,
মার্চেন্ট ব্যাংক সবাই যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করলে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে।










