মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোয় সুদের হার বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে। ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে, তীব্র হচ্ছে মন্দার আশঙ্কা। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)।
আইইএ শুক্রবার জ্বালানি তেলের বাজার শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দেয়া পূর্বাভাসে বলা হয়, এ বছর বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা দাঁড়াবে দৈনিক ১০ কোটি ১৯ লাখ ব্যারেলে। চীনে ব্যাপক হারে ব্যবহার বেড়ে যাওয়া চাহিদা বৃদ্ধিতে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে চাহিদা বৃদ্ধির খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এ নিয়ে টানা পাঁচ সপ্তাহ ঊর্ধ্বমুখিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পণ্যটির বাজার।
চলতি মাসের শুরুতে জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক ও এটির মিত্র জোট ওপেক প্লাস ব্যাপক হারে উত্তোলন কমানোর ঘোষণা দেয়। এ সিদ্ধান্তের আওতায় প্রতিদিন ১৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল করে উত্তোলন কমানো হবে। সিদ্ধান্তটি আগামী মাস থেকে কার্যকর হবে এবং চলবে বছরের শেষ নাগাদ। আইইএ বলছে, উত্তোলক দেশগুলোর এমন সিদ্ধান্তের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিতে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ব্যবহারকারীরা।
আইসিই ফিউচারসে শুক্রবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম ২২ সেন্ট বা দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ৮৬ ডলার ৩১ সেন্টে। অন্যদিকে মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩৬ সেন্ট বা দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি ব্যারেলের মূল্য স্থির হয়েছে ৮২ ডলার ৫২ সেন্টে।
ব্যাংক খাতে অস্থিরতার উদ্বেগ শিথিল হতে শুরু করায় টানা চার সপ্তাহ ধরে অব্যাহত বাড়ছে উভয় বাজার আদর্শের দাম। এ সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
মাসভিত্তিক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, চলতি বছর প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়বে। মোট চাহিদা প্রবৃদ্ধির ৫৭ শতাংশই আসবে জেট জ্বালানি থেকে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানায়, চলতি বছরের শেষ নাগাদ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সরবরাহ দৈনিক ৪ লাখ ব্যারেল করে কমতে পারে। মার্চের শুরুতে ওপেক প্লাসের বাইরের দেশগুলোয় দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল করে জ্বালানি তেল উত্তোলন বেড়েছে। কিন্তু ওপেক প্লাসের উত্তোলন দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল করে কমেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল জানান, বছরের দ্বিতীয়ার্ধজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে সংকট অব্যাহত থাকবে। সংকটের ফলে দাম আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠতে পারে। চলতি মাসের শুরুর দিকেই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর মূল কারণ ওপেক প্লাসের উত্তোলন কমানোর ঘোষণা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে সংকোচনের পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম চীনে চাহিদা বৃদ্ধি। দেশটি জিরো কভিড নীতি থেকে সরে আসায় অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে, গতিশীল হচ্ছে শিপ্লোৎপাদন। এর ফলে সেখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে বড় রদবদল পরিলক্ষিত হয়েছে। ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসনের অজুহাত দেখিয়ে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দেয়াই এর উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে পশ্চিমাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল রুশ জ্বালানি ও আর্থিক খাত।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তার ওপর জি৭ভুক্ত দেশগুলোকে নিয়ে রুশ জ্বালানি তেলের ওপর প্রাইস ক্যাপ আরোপ করেছে।
পাল্টা জবাব দিয়েছে রাশিয়াও। যেসব দেশ প্রাইস ক্যাপ চুক্তিতে অংশ নিয়েছে, সেসব দেশে অধ্যাদেশ জারি করে জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপে মোটাদাগে জ্বালানি পণ্য বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে মস্কো।
বিপরীতে এশিয়া, বিশেষ করে চীন ও ভারতে জ্বালানি তেল বিক্রি ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে রাশিয়া। এসব দেশকে দেয়া হচ্ছে আকর্ষণীয় মূল্যছাড়ের সুবিধা। এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোকে বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করছে। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বেশি দামে জ্বালানিটি বিক্রি করছে বিভিন্ন উত্তোলক দেশ।
রাশিয়া থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় গত শীতে বড় ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কায় ছিল ইউরোপ। কিন্তু শীতের তীব্রতা কম থাকায় সে সংকট তৈরি হয়নি। তবে আগামী শীতে এ অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন ফাতিহ বিরোল।










